কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা রেলওয়েস্টেশন এলাকায় রেললাইনের পার্শ্বে রেলের পরিত্যক্ত জায়গায় টিন ও বাঁশের তৈরি ছাপড়া ঘরে থাকেন দেলাবর মিয়া (৪৭)। জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত এই মানুষটি নদীভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারিয়ে শেষ মেশ ঠাঁই নিয়েছেন রেলের জায়গায় যেখান থেকে যে কোনো সময় উচ্ছেদ হওয়ার ভয়েও থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
জানাগেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদে ভিটেমাটি হারিয়ে মা মোছাঃ জামিলা বেওয়ার সাথে আশ্রয় নেন চিলমারীর সাতঘরি পাড়া এলাকায় নানা বাড়িতে। সেখানেই বড় হন এবং বিয়ে করেন দেলাবর। বিয়ের কয়েক বছর পর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঠাঁই নেন স্থানীয় এক তহশিলদারের ছেড়ে দেয়া জায়গায়। সেখানেও বেশি দিন থাকা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে রেলের পরিত্যক্ত জমিতে টিনের ছাপড়া ঘর তুলে শুরু হয় নতুন জীবন। দেলাবর দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও কয়েক বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতায় এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তাই মজুরি পান অন্য শ্রমিকদের তুলনায় অনেক কম। বেশিরভাগ দিনই কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে উপোস থাকতে হয়। বাধ্য হয়ে তাঁর স্ত্রী আর্জিনা বেগম এখন শ্রমিকের কাজ করেন। তিন মেয়ে সন্তানের মধ্যে বড় মেয়েটি মাদ্রাসায় পড়ে। তবে সংসারের অভাব এতটাই প্রকট যে, মেয়েদের খাতা-কলম কেনার সামর্থ্যও নেই।
আর্জিনা বেগম বলেন, ‘বড় মেয়েটার বয়স ১৪, মাদ্রাসায় পড়ে। কিন্তু ঠিকমতো খেতে দিতে পারি না, বই-খাতা কিভাবে কিনে দেবো? মাঝে মাঝে শুনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই ঘর ভেঙ্গে দিবে। তখন ভাবি, মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবো?’
ঘরে গিয়ে দেখা যায়, একটি টিনের ঘরের ভেতরে দুটি বিছানায় গাদাগাদি করে রাখা আসবাবপত্র। পাশে পলিথিন ও পাটকাটির আরেকটি ছাপড়া ঘরে রান্নার কাজ সেরে নেয়া হয়।
দেলাবর বলেন, ‘আপাতত থাকার জন্য রেলের জায়গাটুকু পেয়েছি, সেখানেই টিন দিয়ে ছাপড়া ঘর তুলে আছি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ঠিকমতো কাজ করতে পারিনা। সন্তানদের কিভাবে মানুষ করবো ভাবতেই চোখে পানি চলে আসে।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য রুকুনুজ্জামান স্বপন বলেন, ‘দেলাবর তার ওয়ার্ডে বাস করছেন ঠিকই কিন্তু ভোটার কার্ডের ঠিকানা অনুযায়ী তিনি অন্য ওয়ার্ডের বাসিন্দা। এজন্য তিনি সরকারী সুযোগ-সুবিধা পাননি। তবে তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন সরকারী সুবিধার আওতায় তার পরিবারকে নিয়ে আসার জন্য।’
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘দেলাবরের মতো অসহায় মানুষদের রেলের ফাঁকা জমিতে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। শুধু মাথার উপর ছাদের আশায় তারা এখানে আছে। সরকারের উচিত দ্রুত তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।’
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সবুজ কুমার বসাক বলেন, ‘অসহায় এ পরিবারটির বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে স্থায়ীভাবে বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং কাজের সুযোগ করে দিতে আমরা চেষ্টা করব।’