লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বসতঘরে দুর্বৃত্তদের আগুনে ছোট মেয়েকে হারানোর কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাণ গেল বড় মেয়েরও। শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়ে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সালমা আক্তার স্মৃতি (১৭) মারা গেছেন। এ ঘটনায় একই পরিবারের দুই কন্যার মৃত্যুতে এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) রাতে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্মৃতির মৃত্যু হয়। লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী রাত ১টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
স্মৃতি সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ও ব্যবসায়ী বেলাল হোসেনের বড় মেয়ে। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে বেলাল হোসেন নিজেও দগ্ধ হন। এর আগে আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় পরিবারের ছোট মেয়ে আয়েশা আক্তার বিনতি (৮)।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) রাতে। ভবানীগঞ্জের চরমনসা গ্রামের সুতারগোপ্তা এলাকায় দুর্বৃত্তরা বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে বেলাল হোসেনের বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আগুনে ঘর ও আসবাবপত্র পুড়ে যায়। সেই আগুনেই আয়েশার মৃত্যু হয়। দগ্ধ হন বেলাল হোসেন, বড় মেয়ে স্মৃতি এবং অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেজো মেয়ে সায়মা আক্তার বিথি।
দগ্ধ বেলাল হোসেন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। স্মৃতি ও বিথিকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্মৃতির শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। বিথির দগ্ধের মাত্রা ছিল তুলনামূলক কম। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বিথিকে হাসপাতাল থেকে ছাড় দেওয়া হলেও স্মৃতির অবস্থা শুরু থেকেই ছিল আশঙ্কাজনক। আইসিইউতে টানা কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানেন তিনি।
এই ঘটনার চার দিন পর মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাতে বেলাল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানায়, ঘটনার পর থেকেই তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি তালা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি তালা লক অবস্থায় এবং একটি খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানোর সরাসরি আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, “ঘটনার দিন আগুনে পুড়ে আয়েশার মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্মৃতিও মারা গেছে। নিহতদের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
পরিবারের সদস্যদের চোখেমুখে এখন শুধুই শোক। স্মৃতির চাচা শাহীন আলম বলেন, ছোট মেয়েকে চোখের সামনে আগুনে পুড়ে মরতে দেখার ধাক্কা সামলাতে পারেননি তার মা নাজমা বেগম। সেই শোক কাটতে না কাটতেই বড় মেয়ের মৃত্যুর খবর আসে।
বেলাল হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “যারা আমার দুই মেয়েকে পুড়িয়ে মেরেছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও পোড়াবাড়ি ঘুরে দেখেন। এলাকায় আতঙ্কের পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জোরালো হচ্ছে।