আরেকটি বছরের শেষ সূর্য অস্ত গেল পশ্চিম আকাশে। সময়ের ধারায় পেছনে পড়ে রইল ২০২৫, স্মৃতির পাতায় লেখা থাকল শোক, প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ আর জাগরণের এক ভারী অধ্যায়। নতুন বছরে পা রাখলেও বিদায়ের ক্ষত এখনো টাটকা। বাংলাদেশের মানুষ ২০২৬-কে স্বাগত জানাচ্ছে একদিকে গভীর বেদনা বুকে নিয়ে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ বদলের দৃঢ় সংকল্পে।
বছরের বিদায়বেলায় পুরো দেশকে আচ্ছন্ন করে ফেলে শোকের আবহ। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ কোটি মানুষের হৃদয়ে নেমে আসে ভার হয়ে। বিদায়ের দিনগুলোতে রাজপথ, প্রাঙ্গণ আর মানুষের চোখেমুখে ফুটে ওঠে সেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, যা প্রমাণ করে তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী ছিলেন না, ছিলেন বহু মানুষের আশা ও আস্থার নাম।
এই শোকের ভার আরও ঘনীভূত হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনায়। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং সমাজকে দাঁড় করিয়েছে এক কঠিন প্রশ্নের সামনে। মানুষ কি এখনো অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর সহিংসতার ছায়া মেনে নেবে, নাকি এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, এই দ্বন্দ্বই ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তকে আরও তীব্র করে তোলে।
তবু এই বেদনার মধ্যেও একটি স্পষ্ট বাস্তবতা সামনে আসে। অগণিত আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। শহীদদের রক্ত, মানুষের লড়াই আর প্রতিবাদের গল্প আজ একটি নতুন সময়ের বীজ বুনে দিয়েছে। ক্ষতবিক্ষত হয়েও বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক পুনর্জাগরণের দ্বারপ্রান্তে। ২০২৫ সালের দুঃখ আর ব্যথা আজ জাতির স্মৃতিতে রূপ নিচ্ছে সাহসের প্রতীকে।
পুরোনো ব্যবস্থার ফাটলগুলো এখন অনেকের চোখে সম্ভাবনার জানালা। যেখানে একসময় দুর্নীতি আর হতাশার কথা শোনা যেত, সেখানে ন্যায়বিচার আর নতুন সুযোগের প্রত্যাশা দানা বাঁধছে। বিভেদের জায়গা দখল করছে ঐক্যের ভাষা। এই বদলের আকাঙ্ক্ষা শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, সাধারণ মানুষও নিজেদের ভাগ্যের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে তরুণ সমাজ। ২০২৫ সালের আন্দোলন, ক্ষোভ আর স্বপ্নে যারা ছিল সবচেয়ে সক্রিয়, তারাই এখন আগামীর রূপরেখা আঁকার সাহস দেখাচ্ছে। বিশৃঙ্খল আর কণ্টকাকীর্ণ হলেও ২০২৫ তাদের কাছে একটি অনিবার্য অধ্যায়, যা না পেরোলেই হয়তো আজকের এই দৃঢ়তা জন্ম নিত না।
২০২৬ সালের ভোর তাই শুধু নতুন ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়। এটি একটি জাতির জন্য নতুন করে দাঁড়ানোর আহ্বান। যে রাজপথগুলো একসময় মিছিলে প্রকম্পিত ছিল, সেখানে এখন শোনা যাচ্ছে আগামীর নির্মাতাদের শান্ত অথচ দৃঢ় পদচারণা। সামনে রয়েছে জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে প্রত্যাশা আর প্রশ্ন একসঙ্গে ভিড় করছে মানুষের মনে।
নতুন এই বাংলাদেশ নিখুঁত নয়, অপূর্ণতা আছে, ক্ষত আছে। কিন্তু এই বাংলাদেশ ভয়কে জয় করতে জানে, স্বপ্ন দেখতে জানে এবং কঠোর পরিশ্রমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে জানে। ২০২৫ সালের প্রতিটি বিসর্জন আজ রূপ নিচ্ছে ন্যায়বিচার, সাম্য আর সমৃদ্ধির ভিত্তিতে।
বিদায় ২০২৫ তাই শুধু একটি বছরের শেষ নয়। এটি শিক্ষা আর ত্যাগের এক কঠিন পাঠ। আর ২০২৬ সেই পাঠকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি। এই জাতি এখন আর কেবল টিকে থাকার কথা ভাবছে না, বরং অদম্য সাহসে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।