কঠিন সময় পার করছে তৈরি পোশাক খাত

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
কঠিন সময় পার করছে তৈরি পোশাক খাত

এফএনএস এক্সক্লুসিভ: রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ, মার্কিন শুল্ক চাপ এবং বড় ধরনের কার্গো দুর্ঘটনার ধাক্কায় ২০২৫ সাল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অন্যতম কঠিন বছর ছিলো। রপ্তানির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, আর কর্মসংস্থানে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। পরিস্থিতি সামাল দিয়ে টিকে থাকলেও শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত পুনরুদ্ধারের জন্য তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে ২০২৬ সালের দিকে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৫ সালে রপ্তানি প্রণোদনা প্রত্যাহার এবং অভ্যন্তরীণ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, যা ব্যবসায়িক আস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। স্বাভাবিক বাণিজ্য প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানা অর্ডার ধরে রাখতে পারেনি।

গত দেড় বছরে দুই শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুই লাখের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে কিছু কারখানা পুনরায় চালু হলেও প্রায় পঞ্চাশ হাজার কর্মসংস্থান ফিরেছে। তবু সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থানের ক্ষতি বড় আকারেই রয়ে গেছে।

উদ্যোক্তারা আশা করেছিলেন, স্থিতিশীল পরিবেশে ব্যবসায়িক আস্থা ফিরে আসবে এবং কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে গতি আসবে। বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টোটা। রপ্তানির প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

রপ্তানি পরিসংখ্যানেও সেই চিত্র স্পষ্ট। ২০২৩ সালে দেশের মোট রপ্তানি ছিল ৩৫.৮৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮.৪৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭.২৩ শতাংশ বেশি। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ২.৫৩ শতাংশ বেশি। আগের বছর একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.২৩ শতাংশ। এই ব্যবধান দেখাচ্ছে, ২০২৫ সালে রপ্তানি কার্যত গতি হারিয়েছে।

বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান ২০২৫ সালকে রপ্তানিকারকদের জন্য একটি মিশ্র বছর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর মতে, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ছাড়া উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন।

বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, খাতটির বর্তমান সংকটের সূত্রপাত ৫ আগস্টের পর থেকে শুরু হওয়া চ্যালেঞ্জে, যা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আরও তীব্র হয়। তিনি বলেন, “সেই সময়ে খাতভিত্তিক শ্রম সমস্যা ছাড়াও পরবর্তী বছরগুলোর জন্য ৯ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়, যার বড় প্রভাব পড়েছে।” তাঁর ভাষায়, ২০২৫ সাল শুরু থেকেই আর্থিকভাবে কঠিন ছিল, যার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে মার্কিন শুল্কনীতি।

ফয়সাল সামাদ জানান, শুল্ক সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে অনেক অর্ডার আটকে যায়। এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপের বাজারেও পড়ে। ফলে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে রপ্তানি আরও দুর্বল হয়ে যায়।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বছরজুড়ে একের পর এক নেতিবাচক ধাক্কা রপ্তানি পারফরম্যান্সকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর মতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুল্ক হুমকি ও অর্ডার স্থবিরতা অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ ও কারখানা বন্ধ থাকার বিষয়গুলোকে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, দেশে কাস্টমস হাউস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল ব্যতিক্রমী, বিশেষ করে এমন একটি দেশে, যেখানে প্রায় সব রপ্তানি আয় তৈরি পোশাক খাতনির্ভর।

রুবেল বিমানবন্দরের কার্গো অগ্নিকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে আনুমানিক ১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক চালান ধ্বংস হয়। এতে সরাসরি রপ্তানি আয় কমে যায়। পাশাপাশি রপ্তানি প্রণোদনা প্রত্যাহার ও স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে বাংলাদেশের মূল্য প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করেছে।

স্বল্পমেয়াদি ধাক্কার বাইরে তিনি কাঠামোগত সমস্যার দিকেও দৃষ্টি দেন। ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, আর অপ্রচলিত বাজারে দুর্বল উপস্থিতি ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পণ্যের বৈচিত্র্য সীমিত থাকাও একটি বড় দুর্বলতা বলে মনে করেন তিনি, বিশেষ করে ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের সঙ্গে তুলনায়।

সব সংকটের মধ্যেও শিল্পসংশ্লিষ্টরা পুরোপুরি হতাশ নন। ফয়সাল সামাদ বলেন, শিল্পটি কোনোভাবে অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। তাঁর আশা, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ব্যবসায়িক গতি ফিরতে পারে। জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক সরকার গঠন হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি নীতিগতভাবে ব্যাংক সুদের হার ধাপে ধাপে কমানো এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এফএসআরইউ প্রকল্প দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানান তিনি, যাতে শিল্পের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে