বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখনও দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুসারে, বিগত অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৯.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৮.৮৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি হয়েছে ২১.১৬ বিলিয়ন ডলার এবং বোনা পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৮.১৯ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বাজারে প্রবৃদ্ধি থাকলেও মাসভিত্তিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অক্টোবর মাসে রপ্তানি হঠাৎ কমে যায় প্রায় ১৯.৬৭ শতাংশ, যা বাজারের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই প্রবৃদ্ধির মাঝেই সামনে আসছে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী ২০২৯ সালের পর বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার হারাবে। এলডিসি উত্তরণ এবং ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্মস) চুক্তির মেয়াদ শেষে ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হবে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। কারণ, বাংলাদেশের শুল্ক বাড়লেও প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে কোনো শুল্ক দিতে হবে না। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র্যাপিড আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয়, ইউরোপের বাজারে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পোশাকের দাম ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কম দামি পোশাক রপ্তানি করে। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাউজার ও টি-শার্টসহ প্রধান ১০টি রপ্তানি পণ্যের দাম চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম। এমনকি কম্বোডিয়াও বাংলাদেশের চেয়ে দামি পণ্য রপ্তানি করে থাকে। মূল প্রবন্ধে আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় হিসেবে বলা হয়, আমদানিনির্ভর হওয়ায় ওভেন পোশাক সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা এবং দেশীয় কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা তৈরি করতে সংযোগ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। নগদ অর্থসহায়তার সুযোগ না থাকলেও লজিস্টিক ব্যয় কমিয়ে সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয় প্রবন্ধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক তাইবুর রহমান বলেন, পোশাক খাতে সুতার মতো কাঁচামালের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। চামড়া খাতেও দেখা যাচ্ছে নিজস্ব অনেক চামড়া থাকার পরও জুতা বানাতে চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে। তাই নিজেদের কাঁচামালের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মো. মুনির চৌধুরী বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কের চেয়ে অনেক সময় অশুল্ক বাধাও বড় হতে পারে। তাই গবেষণায় ভর্তুকি অব্যাহত রাখা যায়। দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। আর মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করতে আমাদের দক্ষ নেগোশিয়েটর দরকার। এ জন্য আলাদা উইং করতে হবে, পুল তৈরি করতে হবে। ইউরোপের বাজারে উন্নত কর্মপরিবেশ একটি ইস্যু হবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো বদরুন্নেসা আহমেদ। তিনি বলেন, সামনে আরও ৪ থেকে ৫ বছর সময় আছে, তাই দক্ষতা বৃদ্ধি করে দামি পণ্য তৈরির দিকে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের কর্মকর্তা মো. মশিউল আলম বলেন, ভবিষ্যতে ২৫ শতাংশের বেশি কার্বন কর আসতে পারে। তাই সেভাবে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। নিট পোশাকে ৭ থেকে ৮ শতাংশ শুল্ক বাড়তে পারে জানিয়ে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের গবেষণা ব্যবস্থাপক হারুনুর রশিদ বলেন, তখন প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যের দাম কমাতে হবে। তাই মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে হবে। আর ন্যূনতম ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করতে হবে। সব মিলিয়ে এপর্যন্ত পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও ২০২৯ সালের পর ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই এখন থেকেই বাজার বৈচিত্র্য, কাঁচামালের স্বয়ংসম্পূর্ণতা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।