‘হ্যাঁ’ ভোটে সমর্থন গণতান্ত্রিক দায়িত্ব, দাবি প্রেস উইংয়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
‘হ্যাঁ’ ভোটে সমর্থন গণতান্ত্রিক দায়িত্ব, দাবি প্রেস উইংয়ের

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য অবস্থানকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। তাদের ভাষ্য, এই অবস্থান প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার পরিপন্থি নয়; বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সরকারের ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রোববার (১৮ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো একাধিক ব্যাখ্যা ও বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা শুধু দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা একটি নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের অপশাসন, শাসনতান্ত্রিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জনআস্থাহীনতার পটভূমিতে যে গণঅভ্যুত্থান ঘটে, তার ধারাবাহিকতাতেই এই সরকার দায়িত্ব নেয়।

দপ্তরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সংস্কার প্রশ্নেই সরকারের অবস্থানকে ঘিরে সমালোচনা উঠেছে। তবে দপ্তরের মতে, এমন সংকটময় সময়ে নীরব থাকা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবকেই প্রকাশ করে।

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে একটি গ্রহণযোগ্য সংস্কার কাঠামো তৈরি করা। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত প্রায় আঠারো মাস ধরে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই ফল।

বিবৃতিতে বলা হয়, “যে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত, গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মুহূর্তে সেই সংস্কার থেকে নিজেকে দূরে রাখবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।” দপ্তরের মতে, সংস্কারের পক্ষে অবস্থান না নেওয়ার পরামর্শ আসলে সরকারের ঘোষিত ম্যান্ডেটকেই ভুলভাবে বোঝার শামিল।

আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার উদাহরণ টেনে প্রেস উইং জানায়, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রশ্নে সরকারপ্রধানদের প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট গণভোট, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা ভোট, ফ্রান্স, তুরস্ক ও কিরগিজস্তানের সাংবিধানিক সংস্কারসহ নানা উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্বের অবস্থানকে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে দেখা হয়নি; বরং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রকাশ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জোর দিয়ে বলেছে, গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নির্ভর করে না। বরং মূল প্রশ্ন হলো ভোটাররা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন কি না, বিরোধী পক্ষ প্রকাশ্যে প্রচারণার সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য কি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই শর্তগুলো অক্ষুণ্ণ রয়েছে বলেই তাদের দাবি।

সরকারি প্রচারণা নিয়েও যে প্রশ্ন উঠেছে, সে বিষয়ে দপ্তরটি বলছে, জেলা পর্যায়ে প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রমের উদ্দেশ্য সংস্কারের বিষয়বস্তু জনগণের কাছে স্পষ্ট করা এবং ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি দূর করা। এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জোরজবরদস্তি বা অতিরিক্ত প্রচার হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

আরও বলা হয়, এই সংস্কার প্রক্রিয়ার ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনী বা রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত নেই। সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাবে ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের হাতে। অধ্যাপক ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের দায়িত্ব সময়সীমাবদ্ধ এবং অন্তর্বর্তী।

বিবৃতির শেষ অংশে বলা হয়, “হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান নীতিগত লঙ্ঘন নয়, বরং তার গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের হাতেই থাকবে। এটাই গণতন্ত্রের প্রকৃত নিশ্চয়তা।”

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে