কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ভুট্টার সবুজ মাঠ এখন আশঙ্কার প্রতীক।যেদিকে চোখ যায় সবুজ ভুট্টা গাছের পাতায় জীবনের ছোঁয়া। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে মৌসুমের শুরুতেই ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু সেই স্বপ্নে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারনে দ্রুত বিস্তার লাভ করা ফল আর্মিওয়ার্ম নামের ক্ষতিকারক পোকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফল আর্মিওয়ার্ম দমনে এককভাবে কীটনাশকের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (ওচগ) অনুসরণ করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। এর মধ্যে রয়েছে-আক্রান্ত গাছের পাতা ও কুশি দ্রুত কেটে মাটিতে পুঁতে ফেলা, নির্দিষ্ট ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে পোকার বিস্তার পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে পোকার আক্রমন কমে যাবে। সরেজমিনে চিলমারী উপজেলার অষ্টমীরচর ইউনিয়নের নটারকান্দি, পূর্ব নটারকান্দি, চিলমারী ইউনিয়নের বান্ডালের চর, কড়াইবরিশালসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়-ভোর থেকেই কৃষকরা মাঠে নেমে পড়েছেন। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ বীজ রোপণ করছেন, কেউ সেচ দিচ্ছেন, আবার কেউ ভুট্টা গাছের আক্রান্ত পাতা ছেঁটে ফেলছেন। তবে বেশিরভাগ কৃষকই এখন ব্যস্ত ক্ষতিকারক পোকা দমনে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক স্প্রে করতে।উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত মৌসুমে (২০২৪-২৫ অর্থবছর) চিলমারীতে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছিল এবং ফলন ছিল সন্তোষজনক। চলতি মৌসুমে(২০২৫-২৬ অর্থবছর) ভুট্টা চাষ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩২০ হেক্টরে, যা গত বছরের তুলনায় ৩২০ হেক্টর বেশি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা ও আর্দ্র পরিবেশ এই পোকা বিস্তারের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।পূর্ব নটারকান্দি গ্রামের ভুট্টা চাষি লাল চাঁন বলেন,“গতবারের মতো এবারও ২ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। কিন্তু শুরুতেই ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার আক্রমণে দিশাহারা হয়ে পড়েছি। কীটনাশক দিয়েও কাজ হচ্ছে না। নতুন কুশি ও গাছের গোড়া কেটে ফেলছে, ফলে গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে লাভ তো দূরের কথা, খরচও উঠবে না।”একই এলাকার কৃষক তাহরাত হোসেন বলেন,“দেড় বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। আশা ছিল ৯০ থেকে ১০০ মন ফলন হবে। বাজার ভালো থাকলে ৫০-৬০ হাজার টাকা লাভ হওয়ার কথা। কিন্তু পোকার আক্রমণে সেই আশা ভেঙে যাচ্ছে। প্রতিদিন যেমন শীত বাড়তেছে তেমনী বাড়ছে পোকার আক্রমণ।”আরেক কৃষক ফজলু মিয়া বলেন,“এই পোকার আক্রমণ সামলাতে পারলেও সামনে আবার মাজরা পোকার ভয় আছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এখন একটার পর একটা পোকা আক্রমণ করছে। সব দিক সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।”কৃষক লাল চাঁন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“নিজেদের টাকায় বীজ, সার, পানি কিনে চাষ করছি। কিন্তু কৃষি অফিসের সরাসরি কোনো পরামর্শ পাই না। ফোন দিলেও অনেক সময় ফোন ধরেন না। বাধ্য হয়ে স্থানীয় দোকানের পরামর্শে কীটনাশক ব্যবহার করছি, যা সব সময় কাজে আসছে না।”উপজেলা কৃষি অফিসার কনক চন্দ্র রায় বলেন,“জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা ও সময়কাল বেড়েছে। একই সঙ্গে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা ও অনিয়মিত আবহাওয়া এখন কৃষিতে নতুন সংকট তৈরি করছে। এসব কারণেই ফল আর্মিওয়ার্মসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক পোকার প্রকোপ আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।বর্তমানে ভুট্টা ক্ষেতে মূলত দুই ধরনের পোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে-গাছের গোড়া কেটে ফেলে কাটুই পোকা এবং কুশি ও পাতা কেটে ক্ষতি করে ফল আর্মিওয়ার্ম। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফল আর্মিওয়ার্ম গাছের গোড়াতেও আক্রমণ করতে পারে, যা কৃষকদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।” তিনি আরও বলেন,“কাটুই পোকার জন্য ল্যামডা-সাইহ্যালোথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক এবং ফল আর্মিওয়ার্ম দমনে এবামেকটিন বেনজোয়েট ও স্পিনোসাড গ্রুপের কীটনাশক সঠিক মাত্রা ও নিয়ম মেনে প্রয়োগ করলে এর থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব।