জুলাই জাতীয় সনদ লেখা হয়েছে রক্ত দিয়ে: আলী রীয়াজ

এফএনএস (এম এ আজিম; খুলনা) : | প্রকাশ: ২২ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম
জুলাই জাতীয় সনদ লেখা হয়েছে রক্ত দিয়ে: আলী রীয়াজ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) এবং গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ দেশের মানুষের আকাঙ্খাকে ধারণ করেছে। এ সনদ কালো কালি দিয়ে ছাপা হলেও প্রকৃত অর্থে লেখা হয়েছে রক্ত দিয়ে। যুবকদের রক্তে আমরা শামিল হতে না পারলেও জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫কে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এবারের গণভোটই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র ব্যবস্থা নির্ধারণের। জাতীয় নির্বাচনে অর্ন্তর্বতীকালীন সরকার নিরপেক্ষ হলেও গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচারণায় কোন বাঁধা নেই। তিনি বলেন, দেশের সাফল্যের দরজা খোলার চাবিকাঠি জনগণের হাতে। দেশ সংস্কার করে সাম্য ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে গণভোটে হ্যাঁ-তে সিল দিতে হবে। গণভোটের মার্কা টিক চিহ্ন।  তিনি (বৃহস্পতিবার) দুপুরে খুলনা বিভাগীয় প্রশাসন আয়োজিত বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্বকরণের উদ্দেশ্যে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন,  আলী রীয়াজ আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত এ জাতি আর কোনো স্বৈরশাসন-দুঃশাসন চায় না। তারা একটি আলোকিত আগামী গড়তে চায়, নতুন দিন আনতে চায়; সে দিন হবে সাম্য, সমতা আর আনন্দের। যেখানে কোনো অন্তরাত্মা কাঁপানো বাহিনীর হাতে গুম হওয়ার ভয় থাকবে না, গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্ক থাকবে না, যেদিনের স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধারা, যেদিন আনতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অকাতরে জীবন বিনিময় করেছে আমাদের ছাত্র-জনতা।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ অর্জন। এই অভ্যুত্থান অপ্রত্যাশিতভাবে দেশের জীবনে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এই লক্ষ্য সামনে রেখে এরইমধ্যে বেশ কিছু সংস্কার করা হয়েছে।’  তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি গভীর ও সুদূরপ্রসারী সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, সে কারণেই দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি প্রয়োজন, আর সে উদ্দেশ্যেই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি গণভোটে অংশ নিয়ে হ্যাঁ-তে রায় দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান। ‘হ্যাঁ’-ভোটের অর্থ ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধীদল একসাথে কাজ করবে। ক্ষমতাসীনরা ইচ্ছেমতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না; গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি নিতে হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, যার ফলে বিচারের বাণী আর নিরবে নিভৃতে কাঁদবে না।’ অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও বলেন, এই সরকার রাজনৈতকভাবে নিরপেক্ষ কিন্তু সংস্কারের পক্ষে প্রচারণা চালানোর দায়িত্ব রয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের গণভোটের হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে বাধা নেই।  যে ব্যবস্থা প্রশাসনকে নিজের ইচ্ছায় পরিণত করে- সেখানে এই সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে ওই সংবিধান থেকে ফ্যাসিবাদের রাস্তা বন্ধ করা। গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব । বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণভোট হয়েছে। সেসব দেশের সরকার প্রধানরা গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, ‘হ্যাঁ’ এর প্রার্থী কে? আমি বলি, হ্যাঁ-এর প্রার্থী আপনি, আমি, আমরা সবাই। কারণ ‘হ্যাঁ’ আমাদের উপহার দেবে, একটি গণতান্ত্রিক-মানবিক বাংলাদেশ। যেটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা। যে ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে। সেই আকাঙ্খা পূরণের জন্য হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার করতে হবে। মানুষের মধ্যে  পরিবর্তনের  আক্ঙ্খা না থাকলে গণঅভ্যুথান হতো না। জুলাই জাতীয় সনদ  কোন ব্যক্তি বা সরকারের এজেন্ডা না, এটা সবার।  মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, ‘গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ হয়ে যাবে; যে পথ আমাদের সংবিধানের দুর্বলতায় তৈরি হয়েছে। গণভোটের মধ্যদিয়ে আমাদের পূর্বসূরীদের পুরোনো স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে উল্লেখ করে মনির হায়দার প্রশ্ন রাখেন, ‘কী ছিলো সেই স্বপ্ন?’ সেই স্বপ্নের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ৫৪ বছর আগে আমাদের পূর্বসূরীরা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় যে স্বাধীন দেশের স্বপ্নে শপথ নিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে নতুন স্বদেশ নির্মিত হবে; যেখানে কোনো বৈষম্য, বঞ্চনা আর শোষণ থাকবে না। অর্থনৈতিক লুটের সাম্রাজ্যের চির উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন রিপোর্ট দিয়েছে, গত ১৬ বছরে দেশ থেকে প্রায় সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। এ টাকা এ দেশের মানুষের টাকা, এ টাকায় দেশের উন্নয়ন হতে পারত। তাই লুটেরাদের লুটপাট বন্ধ করতে হ্যাঁ-তে ভোট দিতে হবে। মনির হায়দার আরও বলেন, ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিলো ফ্যাসিবাদমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ করা। এবারের গণভোট নতুন বাংলাদেশ বা নতুন বন্দোবস্তের পক্ষের জনমত যাচাই। জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে রায় দিলে সংবিধানে ফ্যাসিবাদের রাস্তা বন্ধ হবে।  খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ মোখতার আহমেদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো: মাকসুদ হেলালী, রেঞ্জ ডিআইজি মো: রেজাউল হক ও মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান। মতবিনিময় সভায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলার জেলা প্রশাসক, বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, চেম্বার অব কমার্স, স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে