সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ও টিআইবি, চাঁদপুরের আয়োজনে ‘জীবাশ্ম জ্বালানিকে না বলুন’ এই প্রতিপাদ্যের উপর আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস উপলক্ষে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। টেকসই উন্নয়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সুশাসন নিশ্চিতকল্পে ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ চিত্রলেখা মোড়, চাঁদপুরে সনাক-টিআইবি এই মানববন্ধনের আয়োজন করে। মানববন্ধনে সনাক সভাপতি আলমগীর পাটওয়ারী বলেন, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তর সম্পর্কে সচেতনতার লক্ষ্যে সনাক-টিআইবি বিগত বছরের ন্যায় এবছরও আয়োজন করেছে আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস। সনাক-টিআইবি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের দ্রুত ও অধিকতর কার্যকর বিকাশের উপযোগী সুশাসন নিশ্চিতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি সম্পর্কেও আমাদের সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি, তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব এবং জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি মানববন্ধনে উপস্থিত হওয়ার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান। সনাকের সাবেক সভাপতি কাজী শাহাদাত বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অধিক ব্যবহার ও নির্ভরশীলতার কারণে আমাদের টেকসই উন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে। এছাড়াও জীবাশ্ম জ্বালানির অধিক ব্যবহার টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের উপর ব্যাপব অধিক প্রভাব ফেলে। জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে আমাদের উৎপাদন প্রতিনিয়ত ব্যহত হচ্ছে। পরিবেশ, জলবায়ু অর্থায়ন, বিদ্যুৎ ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানীর কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই আমাদেরকে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আমাদেরকে ক্লিন এনার্জি গ্রহণ ও ব্যবহার বাড়াতে হবে। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে তা ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। দিবসের উপর ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন টিআইবি’র এরিয়া কো-অর্ডিনেটর মোঃ মাসুদ রানা। মানববন্ধনে সাংবাদিক, সনাক-ইয়েস-এসিজি গ্রুপের সদস্যবৃন্দ, চাঁদপুর রেসিডেন্সিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীবৃন্দ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। দিবসটি উপলক্ষ্যে জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিতসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে টিআইবি সংশ্লিষ্ট অংশীজনের বিবেচনার জন্য বেশ কিছু সুপারিশসমূহ প্রস্তাব করছে। যেমন- ১) রাজনৈতিক দলসমূহকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বন্ধ করা এবং জ্বালানি মিশ্রণে নবানয়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ বৃদ্ধির অঙ্গীকার করতে হবে; যার মধ্যে থাকবে- জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা এবং খসড়া ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (ইপিএসএমপি) ২০২৫’ চূড়ান্তকরণের পূর্বে নাগরিক সমাজ, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজিয়ে চূড়ান্ত করা; ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরসহ ‘নেট-জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জ্বালানি খাতে নীতি করায়ত্ত বন্ধ এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রতিরোধসহ এখাত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা; আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও নবায়নযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর প্রকল্পে অর্থায়ন ও এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমানোর জন্য সময়াবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা; নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর-সংক্রান্ত কার্যক্রমে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)- কে একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রদানসহ এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য তহবিল বরাদ্দ এবং গবেষণা ও শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা নিশ্চিত করা; এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। ২) নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫সহ বিদ্যমান সকল নীতি ও পরিকল্পনায় অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। ৩) নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে নীতিগত অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার জন্য এর উৎপাদন ও সরবরাহ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ একটি উপযুক্ত বিনিয়োগ কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। ৪) জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র প্রদান এবং দূষণ ও পরিবেশ-বিষয়ক তদারকিতে স্বচ্ছ ও যথাযথ-প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ৫) আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত জ্বালানি খাতের সকল প্রকল্প প্রস্তাব এবং চুক্তির নথি প্রকাশ করতে হবে। ৬) এনডিসি’র অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বাতিল হওয়া কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিতে সোলারসহ নাবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। ৭) শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের নেট মিটারিং সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন সহজীকরণ, ফিড-ইন-ট্যারিফ কার্যকর এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রণোদনা প্রদান করতে হবে। ৮) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে; স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থেকে প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। ৯) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে সুশাসন ঘাটতি ও দুর্নীতি ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকল্প অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, চুক্তির শর্ত নির্ধারণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।