শেষ হলো সেন্টমার্টিনের পর্যটন মৌসুম, দুশ্চিন্তায় স্থানীয়রা

নিজস্ব প্রতিবেদক
| আপডেট: ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম | প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম
শেষ হলো সেন্টমার্টিনের পর্যটন মৌসুম, দুশ্চিন্তায় স্থানীয়রা

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার লক্ষ্যে এই মৌসুমের জন্য বন্ধ হয়ে গেল প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত। সরকারি বিধিনিষেধ অনুযায়ী শনিবার (৩১ জানুয়ারি) শেষ হয়েছে চলতি মৌসুমের পর্যটন কার্যক্রম। ফলে রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) থেকে কক্সবাজার সেন্টমার্টিন নৌরুটে আর কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করছে না।

সেন্টমার্টিন রুটের পর্যটকবাহী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ জানিয়েছে, ১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই মাসে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করেছেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, “৩১ জানুয়ারি যে জাহাজ সেন্টমার্টিনে গেছে, তাতে কোনো নতুন পর্যটক যাননি। দ্বীপে অবস্থানরত প্রায় ২ হাজার পর্যটককে ফিরিয়ে আনতেই জাহাজটি সেখানে গিয়েছিল।”

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বছর সেন্টমার্টিনে পর্যটক ভ্রমণের সময়সীমা আগের তুলনায় কমানো হয়। সাধারণত প্রতি বছর ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি থাকলেও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় এবার তা সীমিত করে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইন সজিব জানান, শনিবার (৩১ জানুয়ারি) শেষবারের মতো পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিন থেকে পর্যটকদের নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেয়। তিনি বলেন, “রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) থেকে পর্যটকবাহী কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি নেই। ভবিষ্যতে সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই মৌসুমে কক্সবাজার শহর থেকে মোট সাতটি পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনে চলাচল করেছে। জাহাজগুলো হলো এমভি কর্ণফুলি এক্সপ্রেস, এমভি বারো আউলিয়া, এমভি বে ক্রুজ, এমভি কাজল, কেয়ারী সিন্দাবাদ, কেয়ারী ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন এবং আটলান্টিক ক্রুজ।

পর্যটন বন্ধের সিদ্ধান্তে দ্বীপজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পরিবেশ সচেতনদের একাংশ এটিকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। সেন্টমার্টিনে ভ্রমণে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলাউদ্দিন বলেন, “এ বছর পর্যটক সীমিত করায় প্লাস্টিকের ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ এবং প্রবাল পাথর উত্তোলন অনেকটাই কমেছে। পরিবেশ রক্ষায় এটি ভালো উদ্যোগ।”

অন্যদিকে জীবিকার সংকটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ হামিদ বলেন, “পর্যটক আসা বন্ধ হওয়ায় আবার মাছ ধরার কাজে ফিরতে হবে। রিকশা কেনার জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি এখনো শোধ করতে পারিনি।”

সেন্টমার্টিন হোটেল মোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহমান জানান, অনেক ব্যবসায়ী বিনিয়োগের টাকা তুলতেই পারেননি। তাঁর ভাষায়, “এবার বেশির ভাগ ব্যবসায়ী লাভের বদলে লোকসানে পড়েছেন। সামনে কয়েক মাস মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও দীর্ঘ সময় পর্যটন বন্ধ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ পর্যটননির্ভর। হঠাৎ করে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভ্রমণ বন্ধ হওয়ায় সবাই হতাশ।”

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, পর্যটন মৌসুমে এবং বন্ধকালীন সময়েও দ্বীপে পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। রাতের বেলায় সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও বিক্রি নিষিদ্ধ। পাশাপাশি সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক ঝিনুকসহ কোনো জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরচালিত যান চলাচল এবং পলিথিনসহ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

প্রশাসনের মতে, টানা নয় মাস পর্যটক না থাকলে সেন্টমার্টিনের প্রবাল, সামুদ্রিক প্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে। অতিরিক্ত পর্যটক চাপের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে