উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণের হার

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:১০ এএম
উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণের হার

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। তিন মাস আগের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি পুরো আর্থিক খাতকে নড়বড়ে করে তুলেছে। বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অনিয়মের জের এখনও বহন করছে খাতটি। তার মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় থাকা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাপক দুর্নীতির কারণে রুগ্ন হয়ে পড়ে। একই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন আভিভা ফিন্যান্স ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকও অনিয়মের কারণে ধসে পড়ে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে সংকটে থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফিন্যান্স, আভিভা ফিন্যান্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স ও প্রিমিয়ার লিজিং। এর মধ্যে প্রথম চারটি পি কে হালদারের অনিয়মের কারণে ধসে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলেও ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এ জন্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে, যা সরকারের পক্ষ থেকে জোগান দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ৯ প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আমানত ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি আটকে পড়েছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। আভিভা ফিন্যান্সে আটকে আছে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফিন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ মূল্যায়ন করে রোজার আগেই ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এদিকে খেলাপি ঋণ কমাতে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একগুচ্ছ প্রস্তাবনা দিয়েছে। এবিবি মনে করছে, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও সুশাসনের অভাবের কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তাদের প্রস্তাবনায় রয়েছে- খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমোদন, খেলাপিদের ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আংশিক অবলোপনের সুবিধা প্রদান, লিয়ন করা শেয়ার নগদায়নে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঋণের সুদ মওকুফের ব্যবস্থা। এছাড়া প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সম্পদ বিক্রি করে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করা, নিলামে বিক্রিত সম্পত্তি হস্তান্তরে কর-ভ্যাট প্রত্যাহার, নিলাম ক্রেতাদের জন্য প্রণোদনা প্রদান, জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাতিল এবং আদালতের মাধ্যমে ব্যাংকের নামে মালিকানা হস্তান্তরকৃত জমির নামজারি বিনা খরচে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা। এবিবি আরও প্রস্তাব করেছে, খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও জামানতদাতাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত, সঞ্চয়পত্র, সম্পদ ও কর রিটার্নের তথ্য আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই পাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করা। আদালতে গমনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ডাউনপেমেন্ট জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ, সিআইবি প্রতিবেদনের বিপরীতে উচ্চ আদালতের স্টে-অর্ডার সুবিধা রহিত করা, স্টে-অর্ডার প্রদানের ক্ষেত্রে কিস্তিভিত্তিক অর্থ প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ এবং ব্যর্থ হলে তা বাতিল হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এবিবি মনে করছে, খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। এজন্য অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বাড়ানো, থানায় খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের আটকাদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন, অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ রহিত করা এবং দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তারা। একইসঙ্গে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা প্রকাশ, বন্ধকী সম্পদের তালিকা সহজে যাচাইয়ের সুবিধা এবং ব্যক্তিগত সম্পদের ডেটাবেজ প্রণয়ন করার সুপারিশ করেছে। সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পুরো আর্থিক খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেখানে এবিবি খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আনলে আর্থিক খাতের প্রতি আস্থা আরও কমে যাবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে