সবচেয়ে দরিদ্র ও বঞ্চিত জেলার নাম হচ্ছে কুড়িগ্রাম। এই পিছিয়ে পড়া কুড়িগ্রাম থেকে আমাদের উন্নয়ন শুরু হবে ইনশাআল্লাহ। কোনো দাবী জানাতে হবে না। এটা আমাদের হবে নৈতিক দায়িত্ব। এরপর যাবো অন্য বঞ্চিত জেলায়। বঞ্চিতদের আর মিছিল করতে হবে না। এই উত্তরবঙ্গকে আমরা কৃষি শিল্পের রাজধানীতে পরিণত করবো ইনশাআল্লাহ। কৃষি বিপ্লপ হলে সবাই তখন কাজ পেয়ে যাবে। বঞ্চিত এই এলাকায় যেন আল্লাহ মনি মুক্তায় ভরিয়ে দেয়। শুধু কৃষিতে সমৃদ্ধি নয় এই উত্তরবঙ্গ থেকে এখানকার মায়েদের গর্ভ থেকে আগামীর প্রধানমন্ত্রী বের হবে ইনশাল্লাহ। তিনি আরো বলেন, কুড়িগ্রামের প্রধান দুঃখ তিনটি বড় নদী। বর্ষা এলেই এখানকার মানুষের বুক কাঁপতে শুরু করে। এই নদীগুলো হত্যা করে মরুভূমি করা হয়েছে। নদী শাসন ও সংস্কারের নামে টাকা পকেটে তুলেছে। এরকম বিভিন্নভাবে টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে ২৮ হাজার লক্ষ কোটি টাকা। আল্লাহ আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ দিলে ওদের পেটের ভেতর থেকে টাকা বের করে আনবো ইনশাআল্লাহ। কুড়িগ্রামে নির্বাচনী জনসভায় এসব বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বুধবার দুপুরে হেলিকপ্টার যোগে কুড়িগ্রামে আসেন আমীরে জামায়াত ডা: শফিকুর রহমান। দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ডা. শফিকুর রহমান। মোট ২২ মিনিট বক্তব্য রাখেন তিনি। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাইনা আমরা চাই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। আর বিভক্তি নয়। আমরা কোন দলীয় রাষ্ট্র কায়েম করতে চাই না। এ বিজয়ে আমি তিস্তা পাড়ের মানুষের মাঝে গণজোয়ার দেখছি। আমরা দেশে আধিপত্যবাদীদের ক্ষমতা দেখতে চাই না, আমরা চাই সমতা থাকুক বাংলাদেশে। তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ১২তারিখে ভোট দিয়ে পরিবর্তনের বাংলাদেশ গড়বেন। প্রথমে হ্যাঁ ভোট পরে সংসদীয় ভোট দেবেন। ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এর আগে কুড়িগ্রাম এসেছি দলীয় প্রয়োজনে। কিন্তু এবার এসেছি জাতির প্রয়োজনে। যুবক-যুবতি তরুণ-তরুণিদের নেতৃত্বে এদেশের সকল শ্রেণিপেশার মানুষ নারীপুরুষ ২০২৪ সালের গর্বিত জুলাই যুদ্ধের অংশীদার। উত্তরবঙ্গের কাছে কৃতজ্ঞ। কেননা এখানকার আবু সাইদ বুক পেতে দিয়েছিল অধিকার আদায় করতে। এটি বীরদের পরিচয়। রংপুরের সন্তান শহীদ আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে বলেছে অধিকার দাও না হলে গুলি। সাঈদ বুকে তিন তিনটি গুলি নিয়েছে বীরের মতো। এখান থেকেই জুলাই আন্দোলন আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সাঈদ, মুগ্ধ, হাদিসহ ১৪ শত শহীদ হয়েছে। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন যুদ্ধে সাইদসহ ১৪০০ জন এবং পরে হাদী জীবন দিয়েছে। এই ১৪০০ বীরের লাশ এখন জাতির ঘাড়ে। তাদের রক্ত আমাদের নদীগুলোকে লাল করে দিয়েছে। এই বীরদের সাথে আমরা বেঈমানি করবো না বিশ্বাসঘাতকতা করবো না। আমরা এ রক্তের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করবো না। তারা জীবন দিয়ে দেশের যে আমানত আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন, সেই আমানত রক্ষায় প্রয়োজনে আমরাও জীবন দিতে প্রস্তুত।” শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী কাজ করে যাবে জানিয়ে তিনি বলেন, “তাদের প্রত্যাশা ছিল একটি দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া। আমাদের নিজস্ব কোনো স্বপ্ন নেই-তাদের স্বপ্নই আমাদের স্বপ্ন।” তিনি একটি দলের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, "তারা নারীদের গায়ে, মা বোনদের গায়ে হাত দিচ্ছেন। তারা হুমকি দিচ্ছেন কাপড় খুলে নিবেন। তারা বলছেন হিজাব পড়ে আসলে খুলে ফেলো, তাদের যেখানে পাও সেখানে ঠেকিয়ে দাও। লজ্জা লজ্জা। এরা কি মায়ের পেট থেকে আসে নাই? তা হলে মায়ের জাতের গায়ে হাত দেয় কী ভাবে? আপনারা ভয় পাবেন না। চোখে চোখ রেখে কথা বলবেন। এটি আমার বাংলাদেশ, আপনাদের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে আর কোন জমিদার মেনে নেবো না। এই বাংলাদেশ হবে জনগণের বাংলাদেশ। আমরা মায়েদের কথা দিচ্ছি এ দেশে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, জামায়াতে ইসলাম ক্ষমতায় আসলে এদেশে আর নারীরা ধর্ষণের শিকার হবে না। আপনাদের রাস্তাঘাট, কর্মস্থল সব জায়গায় শতভাগ নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করবো। যে দেশে মায়েদের কোন নিরাপত্তা নেই। সে দেশ আমার হতে পারে না। আমরা জাতি ধর্ম দেখবো না। সব ধর্মের নারীদের সম্মান করা আমাদের বড় দায়িত্ব " তিনি অভিযোগ করে বলেন," এখন একটি গোষ্ঠী আমার পিছনে লেগেছে। আমার এক্স আইডি হ্যাক করে যা তা চালায় দিছে। আর অমনি একটা দল ঝাঁপিয়ে পড়ে তাইরে নাইরে গান শুরু করেছে। লজ্জা, ওদের চুনোপুঁটি তো গাইলো বটে তাদের বড় বড় মাথাগুলোও গাইতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু তারা পেরে উঠতে পারেনি, আমাদের সাইবার টিম তাদেরকে গলা টিপে ধরেছে, সত্য কখনো ধামাচাপা দেওয়া যায় না। ইতিমধ্যে মেইন কালপ্রিটকে গতকাল পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সত্য মেঘের আড়ালে ঢাকা তাকে না। সূর্য কে মেঘ ঢেকে রাখতে পারেনা।"
প্রধান অতিথি ডা. শফিকুর রহমান মঞ্চে কুড়িগ্রাম -১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম -৩ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী এবং কুড়িগ্রাম-৪ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে দাঁড়ি পাল্লা প্রতীক তুলেদিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন। এছাড়া কুড়িগ্রাম-২ আসনের ১১ দলীয় জোট সমর্থিত এনসিপির প্রার্থী ড. আতিকুর রহমানকে শাপলা কলি মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। কুড়িগ্রাম জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক মো: আজিজুর রহমান স্বপন এর সভাপতিত্বে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মাওলানা আব্দুল হালিম, এনসিপি'র সদস্য সচিব আখতার হোসেন, রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, কুড়িগ্রামের ৪টি আসনের ১১দলীয় জোটের প্রার্থীরা, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী নিজাম উদ্দিন, সহ সেক্রেটারী মাওলানা আব্দুল হামিদ, শাহজালাল হক সবুজ, জেলা বায়তুল মাল সম্পাদক জহরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট ইয়াসিন আলী, এনসিপি'র জেলা আহবায়ক মো: মুকুল মিয়া, খেলাফত মজলিস রংপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক সবেবর মিয়া প্রমুখ।
তরুণ ও যুবক ভোটারদের উদ্দেশ্যে শফিকুর রহমান বলেন, “যুবকদের হাতে অপমান জনক বেকার ভাতা তুলে দেবো না। যুবকদের সবগুলো হাতকে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশ গড়ার কারিগর হিসাবে শক্তিশালী করবো। কর্মমুখী করে তুলবো ইনশাআল্লাহ। তাদের ন্যায্য পাওনা গুলো হাতে তুলে দিয়ে বলবো, এগিয়ে যাও এ দেশ তোমাদের। তোমরা বিমানের ককপিঠে বসো। আমরা বসবো প্যাজেঞ্জার সিটে। সেই গতিতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। যুবকরা তৈরি হয়ে যাও। দেশের ভার যুবসমাজের হাতে তুলে দিচ্ছি। কোনোভাবে এবার জনতার বিজয় আটকাতে পারবে না। এই সমাজের চাবি এবং নেতৃত্ব তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে আমরা পেছন থেকে তোমাদেরকে শক্তি ও সাহস যোগাব। তোমাদেরকে সমর্থন ও ভালোবাসা দিয়ে যাব।” তিনি বলেন, দমন-পীড়ন কিংবা সংকট-কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণকে ছেড়ে যায়নি জামায়াতে ইসলামী; ভবিষ্যতেও যাবে না। জীবন চলে গেলেও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা হবে না। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত প্রতিহিংসার রাজনীতি করে না। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে অন্যতম নির্যাতিত মজলুম দল এই জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি করেনি। তিনি বলেন, ‘কোনো চান্দাবাজ-বাটপারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে থাকবে না। দলীয়ভাবে আমরা কোনো প্রতিশোধ নেব না। এছাড়া কোনো মামলা বাণিজ্য করব না।’
কুড়িগ্রাম -৪ ( চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর) আসনের জামায়াতের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্রক্ষ্রপুত্র নদীর উপর সেতু করে এই তিন উপজেলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের আহ্বান জানান।
কুড়িগ্রাম -৩ (উলিপুর) আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, দুর্নীতির কারণে দীর্ঘ ৫৪ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত ছিলাম। হ্যাঁ ভোট দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারলে কাঙ্খিত নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারবো আমরা।
কুড়িগ্রাম -১ ( নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী) আসনের জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে এ জনপদে শিল্প কল কলকারখানা তৈরি করে বেকারত্ব সমস্যা সমাধান করবো।
কুড়িগ্রাম -২ ( কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ি উপজেলা) আসনের এনসিপির প্রার্থী ড. আতিকুর রহমান বলেন, কুড়িগ্রাম রাষ্টীয় বৈষম্যের কারণে বিছিয়ে পড়া জনপদ। আর পিছিয়ে থাকতে চাই না। ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে কুড়িগ্রামের বঞ্চনা দূর করতে চাই। দুর্নীতি আর চাঁদাবাজির রাজনীতি পরিহার করে কর্মসংস্থানের রাজনীতি করতে চাই। নদীর বাঁধ নির্মাণ এবং চরাঞ্চলের উন্নয়নের কাজ করতে চাই। এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “১২ তারিখের প্রথম ভোট হবে হ্যাঁ, তারপর হবে সরকার গঠনের ভোট। কোথাও আমরা আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না। দেশে কোন চাঁদাবাজি ছিনতাই রাহাজানি থাকবে না, সব সিন্ডিকেট ভেঙে আমরা চুরমার করে দেবো। হ্যাঁ ভোট হলো আজাদী আর না হলো গোলামী। আমরা ইনসাফ ভিত্তিক মানবিক রাজনীতি করতে চাই। আপনাদের সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।