আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখাকে সামনে রেখে এই ইশতেহার উপস্থাপন করে।
রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে এই ইশতেহার বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর ঘোষণা অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর দলটির জনতার ইশতেহারের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন করা হয়। পরে স্বাগত বক্তব্য দিতে মঞ্চে আসেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ছাড়াও দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত রয়েছেন। একইসঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ইশতেহার ঘোষণার এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকার পরিচালনায় জামায়াতের মোট ২৬টি অগ্রাধিকার এই ইশতেহারে তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারের প্রথম ভাগে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এতে শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, কার্যকর জাতীয় সংসদ, নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, জবাবদিহিতামূলক জনপ্রশাসন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ এবং আইন ও বিচারব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিবে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সেগুলো হলো-
১. 'জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ' এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীন, সার্বভৌমত্ত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন (National interest)।
২. বৈষমাহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন!
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া (Youth First)
৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মযাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন (Wor (Women Participation)
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ (Public Safety and Security)!
৬. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন (Zero Corruption)!
৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন (Tech-based Societyll)
৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পদহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূালা অ্যাবদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরানর বৈষম্য দূরীকরণ (Widespread Employment)!
৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক যাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও বাবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ (Robust and Sustainable Economy)!
১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকাররাবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্ঘকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা । (Strong and Functional Democracy)!
১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, ওম ও বিচারবহিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা। (Justice and Human Rightsi
১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গু পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে July Spirit)
১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা (Agro-Revolution)
১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং 'তিন শূন্য ভিশন' (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বার্জার শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা, বাস্তবায়নের মাধ্যমে 'সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ' গড়া (Food Security and Environmental Sustainability)
১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ণ ও কর্মসংস্থান তৈরি (Industrialisation)i
১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা (Reasonable Salary and Hassle-free Job Environment)!
১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা (Pro-Expatriate Approach)!
১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়; বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিমোব সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা (Inclusive Nation!!
১৯. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান (Universal Healthcare System) এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রাম বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা (Educational Reform)I
২১. দ্রব্যমূলা ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা (Provision of Necessities)!
২২. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা [Transport Revolutionji
২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূলো আবাসন নিশ্চিত করা (Affordable Housing)!
২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী বাবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা (Reform Pro-fascist System)
২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাবাবস্থা চালু করার মাধ্যাম নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত। করা (Social Security)!
২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুধী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা (Welfare State)।
জামায়াত জানায়, ‘জনতার ইশতেহার’ তৈরিতে অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে পাওয়া ৩৭ লাখের বেশি জনমতের প্রতিফলন রাখা হয়েছে। দলটির দাবি, জনগণের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।