খুলনাঞ্চলে মৎস্য পোনা ব্যবসায় অবৈধ সিন্ডিকেট

এফএনএস (এম এ আজিম; খুলনা) : | প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
খুলনাঞ্চলে মৎস্য পোনা ব্যবসায় অবৈধ সিন্ডিকেট

খুলনাঞ্চলে সুন্দরবনসহ বিভিন্ন উপকূলের নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে শিকার করা হচ্ছে পার্সেসহ বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্য পোনা। আর ব্যবসায় গড়ে উঠেছে একটি অবৈধ সিন্ডিকেট। প্রতিদিন লেনদেন এক থেকে দেড় লাখ টাকা। এ সিন্ডিকেটে কোস্টগার্ড ও মৎস্য দপ্তরের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা এবং কথিত সোর্সরা একাট্রা হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ কারবার। এতে একদিকে নির্বিচারে ধংস হচ্ছে মৎস্য প্রজাতি, অন্যদিকে প্রকৃত পোনা ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এদিকে, সম্প্রতি রূপসা টোল প্লাজা থেকে কয়েকজন পোনা ব্যবসায়ীকে আটক করে নির্মমভাবে নির্যাতন করে মুচলেকা ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি ফাঁস হলে আদায়কৃত টাকা তিনি ফেরতও দেন। বিষয়টি নিয়ে মৎস্য বিভাগ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। অপরদিকে, কোস্টগার্ডও এ বিষয়ে সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেনি। এ বিষয়টি নিয়ে মৎস্য চাষীদের  নিয়ে কাজ করা দেশের বৃহৎ সংগঠন ফোয়াব চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে পোনা ব্যবসায়ীদের নির্যাতন, অবৈধ পোনা আহরণ এবং টাকা নিয়ে হয়রাণীর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগে জানা গেছে, সাতক্ষীরার পোনা ব্যবসায়ী আক্তারুল ইসলাম ও আসাদুর রহমানসহ কয়েকজন পোনা ব্যবসায়ী গত ৩১ জানুয়ারি রাতে মোংলার রামপালের বেলাইব্রীজ ও তেঁতুলিয়া ব্রীজ এলাকা থেকে দু’টি মিনি পিকাপে তিন লক্ষাধিক টাকার ১২০ কেজি পার্সে পোনা ক্রয় করেন। ভোর রাত ৪টার দিকে তারা ওই পোনা নিয়ে ফেরার পথে রূপসা সেতু টোল প্লাজায় আসলে কোস্টগার্ড তাদের আটক করে। পোনা ব্যবসায়ী আক্তারুল ইসলাম ও আসাদুর রহমানের অভিযোগ, কোস্টগার্ড সদস্যরা তাদের আটক করে গাড়ী থেকে নামিয়েই লাঠি, হকিস্টিক ও টর্স লাইট দিয়ে বেদম প্রহার করে। পরে তাদের রূপসা টোল প্লাজা অফিসে নিয়ে পূণরায় মারধর করা হয়। মোবাইল কেড়ে নিয়ে ভিডিও করে। পরে দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা আটক রেখে বেলা ১২টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া তাদের প্রায় ১৫ লক্ষাধিক পোনা অক্সিজেন বন্ধ করে মেরে ফেলে অবমুক্ত করা হয়। তারা আরও অভিযোগ করেন, কোস্টগার্ড রূপসা উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমানকে ডেকে এনে তাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে বিকাশে (০১৫৮০-৪১৭৬৫০) ১৫ হাজার টাকা নিয়ে তারপর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।   আক্তারুল ইসলাম ও আসাদুর রহমান জানান, তারা প্রথমবারের মতই বেলাই ব্রীজ এলাকার পোনা ব্যবসায়ী বাবুলের কাছ থেকে পোনা কেনেন। কিন্তু একই এলাকায় জাহিদ নামে আরও একজন পোনা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে। রূপসা সেতু নিরাপদে পার হওয়ার জন্য সে কোস্টগার্ডের নামে গাড়ী প্রতি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে কেটে রাখে। কিন্তু তারা জাহিদকে অতিরিক্ত টাকা না দিয়ে তার পরিবর্তে বাবুলের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পোনা কেনায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে কোস্টগার্ড দিয়ে শুধুমাত্র তাদের দু’টি গাড়ী ধরিয়ে দেয়। কারণ একই সময় তাদের সঙ্গে আরও ৫টি পোনাবাহী গাড়ী টোল প্লাজা দিয়ে পার হলেও শুধুমাত্র তাদের কাছ থেকে সামান্য কথা বলেই ছেড়ে দেয়। এতেই বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এছাড়া পোল প্লাজার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করলেও তার প্রমাণ মিলবে। এভাবে প্রতিদিন টোল প্লাজা দিয়ে ১৫-২০টি গাড়ী অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে পার হচ্ছে। কিন্তু তাদের মত যারা জাহিদ সিন্ডিকেটকে গাড়ী প্রতি সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে না দিচ্ছে শুধুমাত্র তাদেরকেই আটক করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধ পোনা ব্যবসায় জাহিদ সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হচ্ছে- বাসেত ওরফে বাসের ডাকাত ও জাবুসায় আওয়ামী লীগের দোসর সাকিল। আর প্রতিদিন বাসেত, হালিম, আরিফ বিল্লাহ, সামাদ ও সেলিমসহ এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা গাড়ীতে পোনা বহন করছেন। এদিকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে রূপসা উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, তিনি সোর্স ওসিকারের কথা মত ১৫ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। পরে বিকাশে ফেরত দিয়েছি। এটা আমার অপরাধ হয়েছে। কোস্টগার্ড রূপসার কন্টিনজেন্ট কমান্ডার (সিসি) কায়সার আহমেদ বলেন, অবৈধ পোনা ব্যবসায়ীদের আটক করে পোনা অবমুক্ত করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মারধর বা তাদের অফিসে বসে টাকা লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। যদিও এ বিষয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আর কথা না বলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিস ফার্ম ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ  (ফোয়াব) সভাপতি সামছুর রহমান শাহীন বলেন, এভাবে নির্বিচারে অবৈধভাবে পোনা আহরণ করা হলে মৎস্য সম্পদের বিপুল ক্ষতি হবে। এছাড়া অবৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে এসব পোনা পরিবহন ও বিপনন দুঃখজনক। এটা বন্ধ করতে হবে। তিনি পোনা ব্যবসয়ীদের ওপর নির্যাতন এবং অবৈধ পোনা সিন্ডিকেটসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে