বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “দায়িত্ব পেলে পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশের চেহারা পাল্টে যাবে। ৫৪ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।”
শনিবার বিকেলে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সিলেট হচ্ছে দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী। হযরত শাহজালাল (র.) তৎকালীন জুলুমতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে এ ভূখণ্ডে এসেছিলেন। “আমরাও সেই সংগ্রামের উত্তরসূরি। বাংলাদেশ গত ৫৪ বছর ধরে জুলুমের রাজনীতির শিকার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী,”-বলেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমীর বলেন, “আমরা তখনই ঘোষণা দিয়েছিলাম-জামায়াত প্রতিশোধের রাজনীতি করবে না। আমরা ক্ষমা করেছি, মামলা বাণিজ্য করিনি। কিন্তু অন্যরা মামলা বাণিজ্য করেছে, জুলুম করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “যারা জনগণের টাকা চুরি করেছে, আমরা দায়িত্ব পেলে তাদের শান্তিতে থাকতে দেবো না। দেশ-বিদেশ যেখানেই থাকুক, ফিরিয়ে আনা হবে। তবে কেউ স্বেচ্ছায় টাকা ফেরত দিলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।”
কানায় কানায় পূর্ণ আলিয়া মাঠ
বেলা পৌণে আড়াইটার দিকে জনসভার কার্যক্রম শুরু হলেও দুপুর থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা মাঠে আসতে থাকেন। বিকেল ৩টার আগেই আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মাঠের বাইরের সড়কগুলোতেও জনসমাগমে লোকারণ্য সৃষ্টি হয়।
এবারই প্রথম সিলেটে জামায়াতের জনসভায় বিপুল সংখ্যক নারী অংশ নেন। তাদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থাও করা হয়।
সিলেটের বঞ্চনা ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সিলেট খনিজ সম্পদে ভরপুর হলেও সিলেটবাসী তার ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। “সব এলাকায় এখনও গ্যাস ও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি, নদীগুলো ধ্বংস করা হয়েছে, মদ-গাঁজা ও জুয়ায় ছেয়ে গেছে অঞ্চলটি। আমরা দায়িত্ব পেলে এসব বন্ধ করবো।”
তিনি বলেন, “নদী খননের পাশাপাশি নদীবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না।”
সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নামে আন্তর্জাতিক, কাজে নয়। আমরা কাজে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করবো।”
কৃষক, জেলে ও চা শ্রমিকদের জন্য পরিকল্পনা
জামায়াত আমীর বলেন, কৃষকদের হাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হবে, কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা হবে। জেলেদের হাতে জাল দেওয়া হবে-‘জাল যার, জলা তার’ নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানদের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে।
এক্স অ্যাকাউন্ট বিতর্ক প্রসঙ্গে
নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একদল মানুষ মা-বোনদের সম্মান দিতে জানে না। আমার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অপমানজনক পোস্ট দেওয়া হয়েছে। চোর ধরা পড়েছে, তবু চোরের পক্ষেই কথা বলা হচ্ছে। আমি সবাইকে মাফ করে দিয়েছি।”
মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক সংস্কার
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “রাজার ছেলে রাজা হবে-এই সংস্কৃতি বদলাতে চাই। যোগ্য হলে চা শ্রমিকের সন্তানও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাবে।”
তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে বলেন, এরপরও যারা ঘুষ নেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
“আমরা দেশের মালিক নই, চৌকিদার হবো”
সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমি এই সিলেটের সন্তান। আজ জামায়াতের আমীর হিসেবে নয়, আপনাদের একজন হিসেবে দাঁড়িয়েছি। আমাদের একবার সুযোগ দিন। আমরা দেশের মালিক হবো না, আপনাদের চৌকিদার হবো।”
প্রার্থী পরিচিতি ও প্রতীক বিতরণ
জনসভা শেষে জামায়াত আমীর সিলেটের ৬টি ও সুনামগঞ্জের ৩টি আসনের জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের হাতে স্ব স্ব দলীয় প্রতীক তুলে দেন এবং বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, সিলেট মহানগরী আমীর ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।
সঞ্চালনায় ছিলেন মহানগর নায়েবে আমীর ড. নূরুল ইসলাম বাবুল ও সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জাগপার সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান রাশেদ প্রধান, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা।
জনসভায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন আসনের জামায়াত ও জোট মনোনীত প্রার্থীগণ উপস্থিত ছিলেন।