ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসনে এখন নির্বাচনী উত্তাপ বইছে। পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানী (জিয়ানগর) উপজেলা নিয়ে গঠিত ৩ লাখ ৯২ হাজার ১৭৭ ভোটার সমৃদ্ধ এ আসনে কেবলমাত্র দুটি মনোনয়ন দাখিল করা বিএনপি ও জামায়াতের দু’প্রার্থীর মধ্যে চলছে ভোটযুদ্ধ। ধানের শীষের প্রার্থী আলমগীর হোসেন ও দাঁড়িপাল্লা নিয়ে লড়ছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী। এ আসনে মোট ভোটারের মধ্যে পিরোজপুর সদরে ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৮৩ জন, ইন্দুরকানী উপজেলায় ৭৫ হাজার ৩২৮ জন ও নাজিরপুরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৬ জন। এ আসনে মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হিন্দু ভোটার, আর নাজিরপুরের ভোটারের প্রায় ৪৫ শতাংশ হিন্দু ভোটার। নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের ধারনা এবারের নির্বাচনে দু’প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে হিন্দু ভোটার অন্যতম ফ্যাক্টর। সেক্ষেত্রে এবারের নির্বাচনে প্রার্থীকে জয়ী হতে হলে ব্যক্তি ইমেজ এবং ওই ভোট ব্যাংক কাজে লাগাতে হবে বলে সাধারন ভোটারদের ধারনা। ১৯৭৯ সালে এ আসনে আওয়ামীলীগ থেকে শুধাংশু শেখর ২৮ হাজারের কিছু বেশী ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে বিএনপির শহিদুল আলম নিরু পান ১৭ হাজার ভোট, সাবেক এমপিএ মুসলিমলীগের সরদার সুলতান মাহমুদ পান ১৬ হাজার এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরা পান ৬ হাজার ভোট। ‘৯১-এর নির্বাচনে ৫৫ হাজার ৩৯৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন শুধাংশু শেখর। ওই নির্বাচনে বিএনপির গাজী নুরুজ্জামান বাবুল পান ৩৫ হাজার ২২২ ভোট, জামায়াত প্রার্থী তাফাজ্জল হোসাইন ফরিদ পান ১৮ হাজার ৫৮১ ভোট। ‘৯৬ এর নির্বাচনে ৫৫ হাজার ৫২২ ভোট পেয়ে জয়ী হন জামায়াতের মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, হেরে যান আওয়ামীলীগের শুধাংশু শেখর। ২০০১ এর নির্বাচনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১ লাখ ১০ হাজার ১০৮ ভোট পেয়ে ৩৪ হাজার ৭৭৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে শুধাংশু শেখরকে হারান। ভোটের ওই পরিসংখ্যানে দেখা যায় বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী সমমনা দলের ভোট এক হলে জামায়াত বা বিএনপির একক প্রার্থী জয়ী হতে পারেন। সেক্ষেত্রে এবারের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। এ আসনে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার। দীর্ঘ বছর ভোট দিতে না পারা নারী ভোটাররা এবারের নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বেশ উৎসাহী বলে ভোটের মাঠে কাজ করা উভয় প্রার্থীর কর্মীরা বলছেন। সেক্ষেত্রে দু’প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে নারী ভোটারও বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ভোট সংশ্লিষ্টরা। টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর পিরোজপুর জেলা সভাপতি অধ্যাপক খায়রুন্নাহার রুবী বলেন, পিরোজপুর-১ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মাত্র দুজন প্রার্থী। এদের দুজনেই সমান তালে প্রচারনা চালাচ্ছেন। এদের মধ্যে লড়াইও হবে হাড্ডাহাড্ডি। তবে মনে হচ্ছে জয়-পরাজয় অনেকটা নির্ভর করবে হিন্দু ভোটারের উপর। বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় দেখছিনা। নির্বাচন অভিজ্ঞ সাবেক এক রাজনীতিক পিরোজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারন সম্পাদক অ্যাড. আহসানুল কবির বাদল বলেন, পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাসুদ সাঈদী বহু আগ থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচন মাঠে নেমেছেন। প্রচার-প্রচারনায় তিনি অনেক আগানো। বলেন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে হওয়ায় তার রয়েছে বাড়তি অ্যাডভানটেজ। বিএনপি প্রার্থী আলমগীর হোসেনের মনোনয়ন একেবারে শেষ দিকে নিশ্চিত হওয়ায় কাঠামোগত প্রচার-প্রচারনায় তার দেরী হলেও বিএনপি একটি বড় দল, তাদের ভোটার বেশী, মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান এবং জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ খুলে দেওয়া এসব মিলিয়ে বিএনপি প্রার্থীও শক্তিশালী। তার ধারনা দুজনের মধ্যে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। হিন্দু ভোটার সম্পর্কে বলেন, এরা ভোট কেন্দ্রে কম যেতে পারে। যারা যাবে তারা ধানেরশীষে ভোট দিতে পারে বলে তার ধারনা। কারন, তারা মনে করছে বিএনপিই আগামীতে সরকার গঠন করবে।
জামায়াত প্রার্থী মাসুদ সাঈদীর জন্মস্থান ইন্দুরকানী উপজেলায়। এ উপজেলায় তিনি ২০১৪ সালে উপজেলা চেয়াম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেলাওয়ার হোসাইন সাাঈদীর ছেলে ও ইন্দুরকানী নিজ উপজেলা হওয়ায় এখানকার ভোটে তিনি বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে সাধারন ভোটারদের ধারনা। তবে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে ইন্দুরকানী গিয়ে এক জনসভায় ইন্দুরকানী জল থানাকে প্রশাসনিক থানায় উন্নীত করেন এবং পরে সাবেক প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্দুরকানী থানাকে উপজেলায় উন্নীত করে জিয়ানগর নামকরণ করায় এখানকার মানুষের একটি আবেগও কাজ করে বিএনপির পক্ষে। ওই আবেগ ও দলীয় শক্তি এসব মিলে এখানে আলমগীর হোসেনরও রয়েছে একটি শক্ত অবস্থান। পিরোজপুর সদরে জন্ম নেওয়া বিএনপি প্রার্থী আলমগীর হোসেনের রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্য। রাজনীতি ও সমাজ কর্ম করা আলমগীরের বাবা আব্দুস সোবাহানও ছিলেন সমাজ কর্মী ও দানবীর। পিরোজপুর সদরে তার রয়েছে শক্ত ভিত। শহীদ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ইমেজ এবং মজবুত সাংগঠনিক শক্তিতে মাসুদ সাঈদীও রয়েছেন এগিয়ে। সব মিলিয়ে এক সময়ে জোটবদ্ধ থাকা বিএনপি-জামায়াত এর এ দু’প্রার্থীর মধ্যে যারপর নাই লড়াই হবে।
বিএনপির ঐক্য বনাম জামায়াতের ইমেজ দীর্ঘ বছর পর নিজস্ব প্রতীক ধানের শীষ ফিরে পেয়ে পিরোজপুর বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। জেলা বিএনপির আহবায়ক মো. নজরুল ইসলাম খান ও সদস্য সচিব এস এম সাইদুল ইসলাম কিসমত বলেন, পিরোজপুরে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে রাত-দিন কাজ করছে। ধানের শীষের জয়ের বিষয়ে আমরা শতভাগ আশাবাদী। প্রার্থী অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, দীর্ঘ ২৯ বছর পর ধানেরশীষ প্রতিকের প্রার্থী পেয়েছে ভোটাররা। এ প্রতিক পাওয়ায় দলের নেতাকর্মীরা যেমন উজ্জিবিত তেমনি সাধারন ভোটাররাও খুশী। তিনি বলেন বিএনপি এদেশের মানুষের জন্য আপসহীন লড়াই করেছে তাই ধানের শীষের গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ইনশাআল্লাহ ধানেরশীষই জিতবে এ আসনে।
জামায়াত জোট প্রার্থী মাসুদ সাঈদী তিনি বলেন, আমার দল ও আমাকে দুর্নীতি ছঁতে পারেনি। আমার বাবা এ আসনে দু’বার এমপি নির্বাচিত হয়ে এলাকার জন্য কাজ করেছেন। তিনি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আগলে রেখেছেন, তার দ্বারা বা আমাদের দলের দ্বারা হিন্দু ভাই-বোনদের কোনো ক্ষতি হয়নি। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। তবে বলেন, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী যদি জয়ী হয়, আমিই সবার আগে তার জন্য ফুলের মালা নিয়ে যাবো।