বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিনের আলোচিত আইন সংশোধনের উদ্যোগ আপাতত থেমে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধন বাস্তবসম্মত নয় বলে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এতে গভর্নরকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা জোরদার করা এবং জাতীয় সংসদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধতার মতো প্রস্তাবগুলোও আপাতত বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কার দীর্ঘদিনের দাবি। এ লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ টিম বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত করে। খসড়াটির আইনি যাচাইও সম্পন্ন হয়।
২০২৫ সালের বুধবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভায় সংশোধনী প্রস্তাবটি আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে বুধবার (২৭ আগস্ট) আরেকটি পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝিতে সংশোধনী প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে চার মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রস্তাবটি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
সংশোধনী প্রস্তাবে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কমানোর কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদে আমলাতান্ত্রিক উপস্থিতি সীমিত করার প্রস্তাবও ছিল। শুরুতে পর্ষদে কোনো আমলা না রাখার কথা থাকলেও পরে সংশোধন করে সরকারের একজন প্রতিনিধি, ছয়জন স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ, গভর্নর ও একজন ডেপুটি গভর্নরকে নিয়ে পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হতে পারত।
সম্প্রতি গভর্নরের চিঠির জবাবে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ লিখিতভাবে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সুশাসন কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার একটি মৌলিক আইন। তাই এতে সংশোধন আনতে হলে বিস্তারিত পর্যালোচনা এবং অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন। তার মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এ ধরনের ব্যাপক সংশোধনী আনা বাস্তবসম্মত নয়। বরং পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী আইনটি পর্যালোচনা ও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, তিনি এখনও ওই চিঠি হাতে পাননি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন না হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তার ভাষায়, “কেন এটি হলো না, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল।” তিনি জানান, পরবর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি আবারও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল সময়ের অজুহাত নয়, বরং রয়েছে আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের খসড়া অনেক আগেই প্রস্তুত হয়েছিল। এই পর্যায়ে এসে আটকে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই।” তার মতে, পরিচালনা পর্ষদে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব তিনজন থেকে কমিয়ে একজন করার প্রস্তাবই মূলত এই ‘পাওয়ার গেম’-এর কেন্দ্রবিন্দু। আমলাতন্ত্র তাদের কর্তৃত্ব কমাতে চায় না বলেই ফাইলটি লাল ফিতার গিট্টুতে আটকে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ছাড়াও ব্যাংক খাত সংস্কারের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় থাকলেও সেগুলোর কোনোটি অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, অর্থঋণ আদালত আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন। তবে আমানত বিমা আইন সংশোধন করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বিমার আওতায় আনা হয়েছে এবং আমানতকারীর বিমা কভারেজ এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন আটকে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সংস্কারের দায় পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ভবিষ্যতে আদৌ এই সাহসী সংস্কার বাস্তবায়ন হবে কি না।