প্রত্যাশার নতুন বাংলাদেশ গড়তে দেশবাসীকে নৈতিকভাবে ভাবতে হবে বলে আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি ও দুঃশাসনমুক্ত ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন, আর সেই পরিবর্তন সম্ভব জনগণের সম্মিলিত সাহস ও সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, “জামায়াতের হাতেই পরিবর্তন সম্ভব।”
ভাষণে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া। এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে পরিবারতন্ত্র ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তিনি বলেন, “জুলাই হয়েছিল একটি কালো রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য। সেখান থেকেই মুক্তির পথ খুঁজেছে দেশের মানুষ।”
দেশে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও একটি প্রভাবশালী মহল তা বাধাগ্রস্ত করতে চায় বলে অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “পরিবর্তন হলে তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।” এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস সবার থাকে না উল্লেখ করে তিনি আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ ও ওসমান হাদির নাম তুলে ধরেন। তার মতে, তাদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে সাহস জুগিয়েছে।
তরুণদের ভূমিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ এই সাহসী তরুণদের হাতেই রচিত হবে। “আমরা তরুণদের সমাজের ককপিটে বসাতে চাই। তারা হবে বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন, আমরা হব যাত্রী,” বলেন তিনি। একই সঙ্গে আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে আর কেউ তরুণদের হত্যা করার দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।
নারীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারীরা সবচেয়ে নিরাপদ থাকবে। তারা শুধু ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সংসদসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়ও ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি সব ধর্মের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাতের চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করা হবে।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিচার বিভাগকে আমূল সাজাতে হবে এবং সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের বিচারকের আসনে বসাতে হবে। তার ভাষায়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা জামায়াতের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়া জরুরি।
বিদেশনীতি প্রসঙ্গে জামায়াত আমির জানান, ক্ষমতায় গেলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, “আল্লাহ আমাদের পরিবর্তনের এক মহা সুযোগ দিয়েছেন। আসুন, সেই সুযোগ কাজে লাগাই।” প্রবাসীদের অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। প্রবাসে কারও মৃত্যু হলে সম্মানের সঙ্গে মরদেহ দেশে আনার অঙ্গীকার করেন।
ভাষণের এক পর্যায়ে অতীতের নির্বাচনী অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে নির্বাচনের নামে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। এই নিপীড়নের ফলেই রক্তাক্ত জুলাই এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে ভবিষ্যতে আর এমন রক্তপাত দেখতে চান না জানিয়ে বলেন, এমন বাংলাদেশ গড়তে চান যেখানে জনগণকে আর রাস্তায় নামতে হবে না।
এর আগে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, যিনি চরমোনাই পীর নামে পরিচিত। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টায় চরমোনাই পীর এবং সন্ধ্যা ৭টায় নাহিদ ইসলামের ভাষণ সম্প্রচার করে বিটিভি।
ডা. শফিকুর রহমান তার ভাষণে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “দেশের জনগণ কেমন বাংলাদেশ চায়, সেটা দেশের মানুষকেই ঠিক করতে হবে।” ঐক্য, ইনসাফ ও সুশাসনের ভিত্তিতে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র গড়াই তার বক্তব্যের মূল সুর।