হাজী শরীয়তউল্লাহ তাঁতপল্লিতে ৩০০ কোটি টাকার অপচয়

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
হাজী শরীয়তউল্লাহ তাঁতপল্লিতে ৩০০ কোটি টাকার অপচয়

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে আধুনিক রূপ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত হাজী শরীয়তউল্লাহ তাঁতপল্লি প্রকল্প ছিল অন্যতম। কিন্তু আজ সেই প্রকল্প কার্যত বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ সম্পন্ন হলেও দ্বিতীয় ধাপ দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে, আর হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থমকে গেছে। জানা যায়, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার কুতুবপুর এবং শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায় প্রায় ১২০ একর জমিতে তাঁতপল্লি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর একনেকে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথম ধাপে ২৯৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট এবং পুরো প্রকল্প এলাকা ঘিরে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রথম ধাপের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। দ্বিতীয় ধাপে ১ হাজার তাঁতির জন্য দুইতলা আবাসনসহ কারখানা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রত্যেক তাঁতির জন্য ৬০০ বর্গফুট কারখানা স্থান এবং ৮০০ বর্গফুট আবাসন সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল। এছাড়া প্রকল্পের নকশায় আন্তর্জাতিক মানের শোরুম, ডিজাইন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কাঁচামাল বিক্রয় কেন্দ্র, ব্যাংক, তথ্য ও সাইবার কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার, খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, জলাধার এবং বনায়নের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তাঁতশিল্পের আধুনিকায়ন ঘটত, স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হতো এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হতো। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে বিশাল এলাকা বালুতে ঢেকে পড়ে আছে, কোথাও কাশবন, কোথাও পরীক্ষামূলক তরমুজ চাষ। আনসার ব্যারাক ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। এ দৃশ্য শুধু অব্যবস্থাপনার প্রতীক নয়, বরং উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। স্থানীয় কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, বালু ভরাটের কারণে এখানে ধান বা সবজি হয় না। তাই জমি ফেলে না রেখে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। কিন্তু যদি তাঁতপল্লি হতো, তাহলে এ এলাকার অনেক মানুষের কাজ পেত। আরেক কৃষক আলী হাসান বলেন, আমাদের ফসলি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। আমরা টাকা পেয়েছি, কিন্তু এত বড় প্রকল্প এভাবে পড়ে থাকলে কোনো লাভ নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এটা শুধু একটি প্রকল্প নয়, পুরো অঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। দেড় বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকায় মানুষ হতাশ। এই তাঁতপল্লি বাস্তবায়িত হলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হতো। আমাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প আধুনিক রূপ পেত। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের তাঁতশিল্প শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। মসলিন থেকে জামদানি এই শিল্প বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে। তাঁতপল্লি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই ঐতিহ্য নতুন রূপ পেত। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ত। কিন্তু প্রকল্প স্থবির হয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তাঁতশিল্পকে আধুনিকায়নের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শান্তিপুরে তাঁতশিল্পীদের জন্য আবাসন ও কারখানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁতশিল্প সেখানে টিকে আছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায়ও ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পকে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই তুলনা দেখায়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা থাকলে ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আধুনিকায়ন করা সম্ভব। বাংলাদেশে সেই সদিচ্ছা ও দক্ষতার অভাবই প্রকল্প স্থবিরতার মূল কারণ।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা টেকসই করতে হলে তাঁতশিল্পের আধুনিকায়ন জরুরি। তাঁতপল্লি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু কর্মসংস্থানই তৈরি হবে না, বরং ঐতিহ্যবাহী শিল্প নতুন রূপ পাবে।