সারাবিশ্বে বেতার এক জনপ্রিয় গণমাধ্যম

প্রকাশ ঘোষ বিধান | প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
সারাবিশ্বে বেতার এক জনপ্রিয় গণমাধ্যম
প্রকাশ ঘোষ বিধান

সারাবিশ্বে বেতার এখনও অন্যতম জনপ্রিয় গণমাধ্যম। বেতারের রয়েছে পৃথিবীর দুর্গম স্থানে পৌঁছানোর শক্তি। একবিংশ শতাব্দীর আকাশছোঁয়া প্রযুক্তির বিস্তারের পরও বেতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। অনেকেরই ধারণা ইন্টারনেটের অগ্রযাত্রার এই সময়ে রেডিও তার গুরুত্ব হারিয়েছে। এ ধারণাটি মোটেই ঠিক না। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রসারের ফলে সম্প্রচার জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। গ্রামগঞ্জ ও দুর্গম এলাকায় এখনও বেতার তথ্য আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম।

বিশ্ব বেতার দিবস প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ২০১১ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত এবং ২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক স্বীকৃত এই দিবসটি রেডিওর মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান, সম্প্রচারকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানুষের সাথে যোগাযোগের অনন্য মাধ্যম হিসেবে বেতারের গুরুত্ব ও সক্ষমতাকে উদযাপন করে।

দুর্যোগের সময়ে সঠিক বার্তা, দিকনির্দেশনা, সর্বোপরি মহামারি থেকে সুরক্ষা পেতে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এসেছে বেতার, অর্জন করেছে আস্থার জায়গা। বেতারের গুরুত্ব সম্পর্কে  জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্য প্রাপ্তি সহজতর করা এবং বিভিন্ন স্টেশনের মধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন।

বিশ্ব বেতার দিবসের মূল ইতিহাস হলো ১৯৪৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ রেডিও  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৭ সালে, জাতিসংঘের রেডিও এবং জাতিসংঘ সংবাদ কেন্দ্র একীভূত হয়ে জাতিসংঘ সংবাদ গঠন করে। জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কোর মাধ্যমে স্প্যানিশ একাডেমি অব রেডিও এর অনুরোধে ইউনেস্কো ২০০৮ সালে বিশ্ব বেতার দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। প্রথম দিকে ৩০ অক্টোবর বিশ্ব বেতার দিবস হিসেবে ধার্য করা হয়। কিন্তু ২০১১ সালে ইউনেস্কো ১৩ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব বেতার দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ ১৯৪৬ সালের এদিনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল জাতিসংঘ রেডিও। ২০১২ সালেই সর্বপ্রথম দুনিয়াজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশেও তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বেতার, প্রাইভেট এফএম এবং কমিউনিটি রেডিওগুলোর অংশগ্রহণে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসের লক্ষ্য জনসাধারণের মাঝে ও সংবাদমাধ্যমে বেতারের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদেরকে বেতারের মাধ্যমে তথ্য সুলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং বেতার সম্প্রচারকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও পারস্পরিক মতামত ও তথ্য বিনিময় জোরদার করা।

বাংলাদেশ বেতার একটি নাম, একটি ইতিহাস। এই ইতিহাস একদিনে রচিত হয়নি। ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর এদেশে বেতারের প্রতিষ্ঠা। কালক্রমে বেতার আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন, সর্ববৃহৎ ও শক্তিশালী গণমাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

বেতার হল তারবিহীন যোগাযোগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এতে তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে তথ্য প্রেরণ বা গ্রহণ করা হয়।রেডিও বা বেতার প্রযুক্তির প্রধান আবিষ্কারক হিসেবে ইতালীয় বিজ্ঞানী গুগলিয়েলমো মার্কনি-কে গণ্য করা হয়, যিনি ১৮৯৬ সালে প্রথম পেটেন্ট লাভ করেন। তবে, এর আগে ১৮৮৭ সালে হেনরিক হার্টজ রেডিও তরঙ্গ আবিষ্কার করেন এবং জগদীশ চন্দ্র বসুও এর অন্যতম পথিকৃৎ। তবে বাণিজ্যিকভাবে রেডিওর প্রচলনে মার্কনির অবদান সবচেয়ে বেশি। ১৮৯৭ সাল থেকে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে শব্দ বা সংকেত প্রেরণ শুরু হয়। যদিও মার্কনিকে প্রধান কৃতিত্ব দেওয়া হয়, তবুও রেডিও আবিষ্কার একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যেখানে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী অবদান রেখেছেন।

বাংলাদেশ বেতারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি মিডিয়াম ওয়েভ স্টেশন চালু করে। ঢাকার নাজিম উদ্দীন রোডের দোতলা বাড়িতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্র চালু হয়। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান ব্রডকাস্টিং ঢাকা নামে এবং পরে ১৯৪৮ সালে রেডিও পাকিস্তান নামে তা পরিচিত হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ বেতার। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব বেতার দিবস পালিত হয়ে আসছে। এতে অংশ নেয় বাংলাদেশ বেতার, প্রাইভেট এফএম এবং কমিউনিটি রেডিওগুলো। সরকার এর মধ্যে ২৮টি প্রাইভেট এফএম এবং ৩২টিরও বেশি কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ বেতার ১২টি আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্র এবং ৩৫টি এফএম পরিচালনা করছে। সারা দেশে পাঁচ হাজার শ্রোতা ক্লাব গঠিত হয়েছে শ্রোতাদের উদ্যোগে।

সারা বিশ্বে বেতার এখনো অন্যতম জনপ্রিয় গণমাধ্যম। বেতারের রয়েছে পৃথিবীর দুর্গম স্থানে পৌঁছানোর অসীম শক্তি। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রসারের ফলে সম্প্রচার জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিযোগিতাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। গ্রামগঞ্জ ও দুর্গম এলাকায় এখনো বেতার তথ্য আদান প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম হিসেবেই বিবেচিত। দুর্যোগকালীন সময়ে, শিক্ষা ও বিনোদন প্রচারে এবং মতামত বিনিময়ে রেডিও অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিক।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট