বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু নিজস্ব এআই ব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে এআইভিত্তিক টুলের ব্যবহার বেড়েছে, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদনে এর উপস্থিতি স্পষ্ট হলেও নির্মাতা হিসেবে বাংলাদেশ এখনো দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রধান কারণ হলো উন্মুক্ত ও উচ্চমানের বাংলা ভাষার ডেটাসেটের ঘাটতি। এআই মডেল যতটা ভালো, ততটাই ভালো তার প্রশিক্ষণ ডেটা। বড় ও উন্মুক্ত বাংলা ডেটাসেট ছাড়া কার্যকর চ্যাটবট, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, অনুবাদ টুল বা সিদ্ধান্ত-সহায়ক সিস্টেম তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। টেলেনর এশিয়ার সামপ্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এআই টুল ব্যবহার করেন, যার মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করেন। কর্মক্ষেত্রে গ্রহণের হার ৪৪ শতাংশ। তবে এসব ব্যবহার মূলত বিদেশি মডেল ও প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকসেবা অটোমেশন বা ডেটা অ্যানালিটিক্সে এআই ব্যবহার করছে, কিন্তু নিজস্ব ভাষাভিত্তিক সিস্টেম তৈরির উদ্যোগ খুব সীমিত। শিক্ষা খাতে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি হলেও বাস্তব প্রয়োগ এখনো সীমিত। মুক্তপাঠ, টিচার্স পোর্টাল ও দীক্ষার মতো উদ্যোগে শিক্ষা ডিজিটালাইজেশনে অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু এআইভিত্তিক শিক্ষণ টুল মূলত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭৫ শতাংশে কম্পিউটার থাকলেও মাত্র ৫৩ শতাংশে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। এই বৈষম্য শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার এআইুসম্পর্কিত গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও সেগুলোকে ব্যবহারিক টুলে রূপান্তর করা এখনও চ্যালেঞ্জ। একটি পাইলট প্রকল্পে এআই দিয়ে বাংলা গণিত পাঠ্যবই ইংরেজিতে অনুবাদ করা হলে তাতে ভুলে ভরা ও সাংস্কৃতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক কনটেন্ট তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতা বলে দেয়, পর্যাপ্ত স্থানীয় ভাষার ডেটা না থাকলে বৈশ্বিক এআই মডেল কার্যকর ফল দিতে পারে না। স্বাস্থ্য, কৃষি, শাসনব্যবস্থা ও জনসেবায়ও এআই বিস্তারের জন্য প্রয়োজন অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন, বানান পরীক্ষক, সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস, স্পিচ রিকগনিশন ও প্রাকৃতিক ভাষা বোঝার ডেটাসেট। আইসিটি বিভাগের অধীনে এফবিএলআইসিটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলা ওসিআর ইঞ্জিন, বানান পরীক্ষক ও সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইজার তৈরি করা হয়েছে, তবে এসব টুলের পেছনের ডেটাসেটগুলো মূলত বন্ধ অবস্থায় থাকায় গবেষক, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবকদের পুনঃব্যবহারের সুযোগ সীমিত। আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভাষার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এসব ভাষার অনেকগুলোর মানসম্মত লিপি, ডিজিটাল ফন্ট বা গঠিত করপাস নেই। ফলে এআই উন্নয়ন তো দূরের কথা, মৌলিক ডিজিটাল সংরক্ষণও খুব সীমিত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কিছু নথিভুক্তকরণ উদ্যোগ নিলেও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এআই ডেটাসেট থেকে ভাষাগত বৈচিত্র্য বাদ পড়লে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ডিজিটাল উপস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়বে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা। বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র আটটি ডেটা সেন্টার রয়েছে এবং বৈশ্বিক ডেটা অবকাঠামো সূচকে দেশের অবস্থান নিচের দিকে। অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, সীমিত উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের উচ্চ খরচ বড় পরিসরে এআই গবেষণা ও প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ, শহরে ৬৬ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এই বৈষম্য এআই ব্যবহারের সুযোগকে অসম করে তুলছে। ইউনেসকোর ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এআই ব্যবহার ও সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলা ভাষার কিছু টুল থাকলেও উন্মুক্ত ডেটাসেটের অভাবকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দ্রুত জাতীয় এআই নীতিমালা চূড়ান্ত করা, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, স্বচ্ছ সরকারি এআই ক্রয়প্রক্রিয়া এবং তথ্য অধিকার আইন হালনাগাদের সুপারিশ করা হয়েছে। রোডম্যাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলা ও আদিবাসী ভাষার ডেটাসেট উন্নয়ন। টেক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও আমরা নির্মাতা হিসেবে পিছিয়ে আছি। এর মূল কারণ হলো উন্মুক্ত ডেটাসেটের অভাব। ডেটা ছাড়া এআই অন্ধ। যতদিন না বাংলা ডেটা উন্মুক্ত, সহজলভ্য ও স্কেলযোগ্য হচ্ছে, ততদিন আমাদের অগ্রগতি সীমাবদ্ধই থাকবে। একই মত দিয়েছেন ইউনেসকোর এআই নীতিমালা কর্মশালায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ যদি দ্রুত উন্মুক্ত ডেটাসেট তৈরি না করে, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় স্থায়ীভাবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। স্থানীয় ভাষা ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এআই সিস্টেম ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনসেবায় কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল এআই ব্যবহারকারী বাজারগুলোর একটি হয়ে উঠছে। তবে ভাষা ডেটা, অবকাঠামো ও গভর্ন্যান্সে মৌলিক বিনিয়োগ ছাড়া দেশটি বৈশ্বিক এআই প্রযুক্তির নীরব ভোক্তায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একমত যে এখনই সময় উচ্চমানের উন্মুক্ত বাংলা ডেটাসেট তৈরিতে জাতীয় উদ্যোগ নেওয়ার।