১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন বরিশালের বীর সন্তানেরা। মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঢাকার রাজপথের সাথে সাথে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো বরিশালে। কারণ রাষ্ট্রভাষার জন্য গঠিত কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ছিলেন বরিশালের গৌরনদীর কৃতি সন্তান কাজী গোলাম মাহবুব। এছাড়াও ওই কমিটিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ভোলার সন্তান শামসুল আলম, বরিশালের আবদুর রহমান চৌধুরী (বিচারপতি), আখতার উদ্দিন আহমেদ, এম ডব্লিউ লকিতুল্লাহ এবং অনিল দাস চৌধুরীসহ বৃহত্তর বরিশালের আরও অনেক ভাষা সৈনিক। শুধু তাই নয়, একুশে ফেব্রুয়ারির সাংস্কৃতিক চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন বৃহত্তর বরিশালের কবি সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিল্পীরা। ভাষা আন্দোলনের পর যেসব গান-কবিতা সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তার অধিকাংশরই প্রতিষ্ঠাতা হলেন বরিশালের সন্তান।
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, প্রথম সুরকার আব্দুল লতিফ, পরবর্তী ও বর্তমান সুরকার আলতাফ মাহমুদ সবাই বরিশালের কৃতি সন্তান। তবে তাদের স্মরণে কোনো আয়োজন নেই এই অঞ্চলে। ভাষা আন্দোলনে শহীদদের নাম ছাড়া তরুণ প্রজন্ম জানেন না মাতৃভাষা আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা বরিশালের। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কংক্রিটে নির্মিত শহীদ মিনারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বরিশালের বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করেন, কংক্রিটে নির্মিত শহীদ মিনারের চেয়ে মননে নির্মিত শহীদ মিনার দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ভাষা সংগ্রামী, প্রেক্ষাপট ও এর সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এখন অতীব জরুরি হয়ে পরেছে। সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশাল জেলা শাখার সাবেক সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, একুশের অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটির গীতিকার আব্দুল গাফফার চৌধুরী, সুরকার আব্দুল লতিফ এবং শহীদ আলতাফ মাহামুদের বাড়ি বরিশালে। এছাড়া আন্দোলনে অনন্য অবদান রাখা দার্শনিক সরদার ফজলুল করিমের বাড়িও বরিশালে। ভাষা আন্দোলনের সাথে সারাদেশের সাংস্কৃতিক, প্রগতিশীল, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্রসমাজ একাত্মতা পোষণ করেছিল। এছাড়াও ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বদানে বরিশালের মানুষদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কবি হেনরী স্বপন বলেন, ভাষা আন্দোলনে বরিশালের নেতৃবৃন্দের যে অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে তার কিছুই জানে না বর্তমান প্রজন্ম। আমি মনে করি, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বরিশালের যেসব মানুষ কেন্দ্রীয়ভাবে অবদান রেখেছেন তাদের স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা তাদের নাম ফলক তৈরি করা উচিত। কিন্তু আজ পর্যন্ত এখানকার নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় প্রশাসন, শিল্প-সংস্কৃতির মানুষ তার কিছুই করেননি। এটি আমাদের ব্যর্থতা, কারণ আজ পর্যন্ত তরুণ প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া মানুষদের পরিচয় করাতে পারিনি কিংবা ইতিহাস তুলে ধরতে পারেনি। গবেষক আনিসুর রহমান খান স্বপন বলেন, ভাষা আন্দোলনে বরিশালের একটি অনন্য অবদান রয়েছে। ভাষা আন্দোলন সারা বাংলাদেশের আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বরিশালের সন্তান কাজী গোলাম মাহবুব। তাদের নাম এখন অনেকেই জানেন না। ফলে অনেক ভুল নাম উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস এবং আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের সর্ম্পকে জানানো দরকার। কারণ ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা পাঁচজনই ছিলেন বরিশালের সন্তান। সেই শ্রদ্ধেয় মানুষদের স্মরণতো দূরের কথা, বর্তমান প্রজন্ম তাদের অনেকের নামও বলতে পারছেনা।