অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছে সরকার। ১১৭টি থেকে বাড়িয়ে ২৯৫টি ওষুধকে এ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে। সরকারের দাবি, এই সিদ্ধান্তের ফলে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে। তবে ওষুধ শিল্পের মালিকদের একাংশ এ উদ্যোগকে একতরফা ও বাস্তবতা-বিবর্জিত বলে মনে করছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে-জনস্বার্থ রক্ষার এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে এবং এর বাস্তবায়ন কতটা টেকসই? সরকারের যুক্তি অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মানুষের পকেট থেকে যায় ওষুধ কিনতে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এটি বড় ধরনের চাপ। সরকার বলছে, নতুন তালিকাভুক্ত ওষুধগুলো দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার চাহিদা এবং একই পরিমাণ রোগ নিরাময়ের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্য কাঠামো ও সরবরাহ নিশ্চিতে বাধ্যবাধকতা যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। কাগজে-কলমে এসব উদ্যোগ জনস্বাস্থ্যের পক্ষে ইতিবাচক। তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোও কম নয়। নতুন নীতিতে ওষুধ কোম্পানিগুলোকে তাদের মোট বিক্রয়ের অন্তত ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনে বাধ্য করা হয়েছে। শর্ত না মানলে নতুন ওষুধের অনুমোদন বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে দাম সমন্বয়ের জন্য চার বছর সময় দেওয়ার কথা বলা হলেও কাঁচামালের মূল্য, জ্বালানি খরচ, মুদ্রা বিনিময় হার ও উৎপাদন ব্যয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় এই সময়সীমা যথেষ্ট কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীতে দেখা গেছে, কঠোর মূল্যনিয়ন্ত্রণের ফলে কিছু ওষুধ বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে বা নিম্নমানের বিকল্পের ঝুঁকি বেড়েছে। ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। যদিও সরকার বলছে, টাস্কফোর্স ও বিশেষ কমিটিতে শিল্প প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন অংশীজন যুক্ত ছিলেন, তবু আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। নীতি যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নে শিল্পখাতের সহযোগিতা না পেলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। এ প্রেক্ষাপটে সরকারি উদ্যোগে ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বড় পরিসরে উৎপাদন করা গেলে বাজারে সরবরাহের চাপ কমতে পারে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তবে এটিও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। সব মিলিয়ে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ একটি সাহসী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, নিয়মিত পর্যালোচনা এবং সরকার ও শিল্পখাতের মধ্যে আস্থাভিত্তিক সংলাপের ওপর। জনস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যদি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়, তবে সেই উদ্যোগই উল্টো সংকট ডেকে আনতে পারে। ভারসাম্যপূর্ণ পথ খুঁজে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।