ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি কারচুপির অভিযোগ তোলার পর নির্বাচন কমিশন কেন তদন্ত ছাড়াই ‘তড়িঘড়ি’ করে গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ করল, সেই প্রশ্ন তুলেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন।
বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংস্থার সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “নির্বাচনের সময় কারচুপি কিংবা নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে কিনা, এ নিয়ে যদি প্রশ্ন উঠে তাহলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত সাপেক্ষে সে নির্বাচন বাতিল হতে পারবে এবং নির্বাচন কমিশন পুনঃনির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারবে। এবার এই প্রশ্নগুলো উঠেছে, আপনারা তুলেছেন আমরাও তুলেছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে নাই, নির্বাচন কমিশন বরং তড়িঘড়ি করে গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ করে দিয়েছে।”
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বদিউল আলম বলেন, “গেজেট প্রকাশ করার তাৎপর্য হল, যখন গেজেট প্রকাশ হয়, তখন নির্বাচন কমিশন মুক্ত হয়ে যায়। তাদের আর কোনো কিছু করার নাই। এখন আদালতের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
কিন্তু অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনেরই তদন্ত করা ‘উচিত ছিল’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যেহেতু এই প্রশ্নগুলো উঠেছে যে তড়িঘড়ি করে... আমরা নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছিলাম যেন তদন্ত সাপেক্ষে এই ঋণখেলাপি বিলখেলাপি, দ্বৈত নাগরিক এবং বিভিন্ন যেসব ক্ষেত্রে অযোগ্যতা আছে, সেগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর যেন এই গেজেট প্রকাশ করে।
এসময় সুজন জানায়, সদ্যগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটে বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৭১ জনের সম্পদ কোটি টাকার বেশি। এই হিসাবে এমপি হওয়াদের ৯১ দশমিক ২৫ শতাংশই কোটিপতি। এসব কোটিপতি এমপিদের মধ্যে ৫ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক ১৮৭ জন যার সমীকরণ দাঁড়ায় ৬২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে নির্বাচিত ২০৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০১ জন (৯৬ দশমিক ১৭ শতাংশ) কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত ৬৮ জনের মধ্যে ৫২ জন (৭৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ) কোটিপতি। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২৫ লাখ টাকার কম সম্পদের মালিক মাত্র ২ জন (০ দশমিক ৬৭ শতাংশ)। সম্পদের ঘর পূরণ না করা ৩ জনসহ এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ জনে (১ দশমিক ৬৮ শতাংশ)।
সুজনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তুলনায় নবনির্বাচিতদের মধ্যে কোটিপতির হার বেড়েছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতির হার ছিল ৫৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ২৫ লাখ টাকার কম সম্পদের মালিক প্রার্থীদের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ (৩৭৯ জন)। সম্পদের ঘর পূরণ না করা ৫৮ জনসহ এ হার ছিল ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ (৪৩৭ জন)। তবে নির্বাচিতদের মধ্যে স্বল্প সম্পদের মালিকদের হার তুলনামূলকভাবে কম।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, তখন বিজয়ীদের মধ্যে কোটিপতির হার ছিল ৮৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ; বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৯১ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে, দ্বাদশ সংসদে স্বল্প সম্পদের (২৫ লাখ টাকার কম) মালিক বিজয়ী ছিলেন ৩ দশমিক ০১ শতাংশ; বর্তমানে তা কমে হয়েছে ০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
বিশ্লেষণে বলা হয়, স্বল্প সম্পদের অধিকারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও নির্বাচিত হওয়ার হার কমছে; বিপরীতে অধিক সম্পদের মালিকদের অংশগ্রহণ ও বিজয়ের হার বাড়ছে।
শীর্ষ ১০ সম্পদশালী এমপি হলেন- শরীয়তপুর-১ আসন থেকে বিএনপি মনোনীত সাঈদ আহমেদ। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১১৯৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫৬ হাজার ১১০ টাকা। আবদুল আউয়াল মিন্টু (ফেনী-৩, বিএনপি): ৯৪৬ কোটি ৮১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ টাকা। জাকারিয়া তাহের (কুমিল্লা-৮): ৭৭০ কোটি ৮৯ লাখ ১৭ হাজার ৭৯৪ টাকা। গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ (বগুড়া-৫): ৬১৩ কোটি ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার ৯৯৭ টাকা। মো. সফিকুর রহমান (কিরণ) (শরীয়তপুর-২): ৫৫৭ কোটি ৬৪ লাখ ৯১ হাজার ৪৯০ টাকা। ফখর উদ্দিন আহমেদ (ময়মনসিংহ-১১): ৪৬৫ কোটি ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪২ টাকা। নাসের রহমান (মৌলভীবাজার-৩): ৩৮০ কোটি ৬৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৯ টাকা। মো. জালাল উদ্দিন (চাঁদপুর-২): ৩৬৪ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ১০৬ টাকা। মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ (ঢাকা-৮): ৩২৫ কোটি ৯৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৬ টাকা। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবদুল হান্নান (চাঁদপুর-৪): ৩১৮ কোটি ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৪২৮ টাকা।
আজ সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
সুজনের সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার।