প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষা

এফএনএস
| আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম | প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষা

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সাপ্তাহিক ছুটিতে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সফরে গিয়ে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা যে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিয়েছেন, তা দেশের রাজনীতিতে এক পরিচিত দৃশ্য। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণ-এসব লক্ষ্য জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি। তবে প্রশ্ন হলো, এই ঘোষণাগুলো কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, আর কতটা রাজনৈতিক বার্তা মাত্র। নতুন সরকারের শুরুতেই বাজার স্থিতিশীল রাখা ও রমজানে সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা কাঠামোগত সমস্যা; শুধু আশ্বাসে বাজার স্থির থাকে না। কার্যকর মনিটরিং, প্রতিযোগিতামূলক বাজারনীতি এবং সিন্ডিকেট ভাঙার দৃশ্যমান পদক্ষেপ ছাড়া ভোক্তাদের আস্থা অর্জন কঠিন। স্বাস্থ্যসেবায় “ডাক্তার মানুষের পেছনে ঘুরবে” ধরনের প্রতিশ্রুতি জনকল্যাণমূলক হলেও বাস্তবতায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা-জনবল সংকট, অবকাঠামোর দুর্বলতা, অনানুষ্ঠানিক ব্যয়-বড় চ্যালেঞ্জ। একইভাবে ভূমি, গৃহায়ন ও গণপূর্তসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার নতুন নয়; কিন্তু এ খাতে স্বচ্ছতা আনতে হলে প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল সেবা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার কঠোর প্রমাণ প্রয়োজন। কৃষিকে অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে শক্তিশালী করার ঘোষণা সময়োপযোগী। জলবায়ু পরিবর্তন, সেচ ব্যয়, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে সমন্বিত নীতি ছাড়া কৃষি উন্নয়ন টেকসই হবে না। একইভাবে সড়কে চাঁদাবাজি শূন্যের ঘোষণা কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার-এসব বক্তব্য রাজনৈতিক আশ্বাসের পর্যায়ে থাকলে জনসাধারণের আস্থা দ্রুত ক্ষয় হয়। ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে লক্ষ্যভিত্তিক উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যভিত্তিক ডাটাবেজ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন না হলে এমন কর্মসূচি কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারে না। হজ ব্যবস্থাপনা থেকে পরিবেশ সুরক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা সমন্বিত রাষ্ট্র পরিচালনার বড় চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে আসে। প্রথম সফরে নেতাকর্মী ও প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় সরকারের জন্য জনসংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু নির্বাচনী এলাকার সংবর্ধনা ও বক্তব্যের বাইরে জাতীয় নীতিনির্ধারণের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত সরকারগুলোর সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে। নতুন সরকারের জন্য এটি সময়ের কঠিন পরীক্ষা। প্রতিশ্রুতির তালিকা দীর্ঘ, প্রত্যাশা উচ্চ, আর বাস্তবতা জটিল। এখন প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, সময়সীমা নির্ধারণ এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন। অন্যথায় এই প্রতিশ্রুতিগুলোও অতীতের মতো রাজনৈতিক বক্তৃতার আর্কাইভে যুক্ত হয়ে যাবে, আর জনগণের আস্থা আবারও হতাশার ভারে নুয়ে পড়বে।