বাংলাদেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবিক সংকটের প্রতিফলন। জানুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৪৬ জন নিহত এবং ১,২০৪ জন আহত হওয়ার তথ্য শুধু পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতাই নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার দিকেও ইঙ্গিত করে। একই সময়ে রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮৬ জন-যা উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা। প্রতিবেদন অনুযায়ী মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার উচ্চ হার বিশেষভাবে চিন্তার বিষয়। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩৭ শতাংশ মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট হওয়া থেকে বোঝা যায়, তরুণদের দ্রুতগামী ও ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল এবং নিয়ন্ত্রণহীন ছোট যানবাহনের বিস্তার কতটা বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে ট্রাক, বাস, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশার অংশগ্রহণ বহুমাত্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে, যেখানে বড় ও ছোট যানবাহন একই অবকাঠামোতে চলাচল করে বিপদের মাত্রা বাড়াচ্ছে। নিহতদের পেশাগত বৈচিত্র্য-চালক, পথচারী, নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য-প্রমাণ করে যে সড়ক নিরাপত্তা কেবল পরিবহন খাতের সমস্যা নয়; এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিটি দুর্ঘটনা একটি পরিবার, একটি সম্প্রদায় এবং অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে নীতি ও কৌশলগত দুর্বলতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি এবং মহাসড়কে ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচলকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারণ নতুন নয়; বরং বছরের পর বছর একই সমস্যা চিহ্নিত হলেও কার্যকর সমাধান বাস্তবায়নের ঘাটতি থেকেই গেছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে সড়ক নিরাপত্তা একটি স্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশ-আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক, সিসি ক্যামেরাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সার্ভিস লেন নির্মাণ, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ এবং বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স-বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। তবে সুপারিশের তালিকা নতুন নয়; নতুন দরকার কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং স্বচ্ছ জবাবদিহি। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; চালক, যাত্রী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্ব ও কাঠামোগত সংস্কারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। উন্নয়নের মহাসড়কে এগোতে হলে প্রথমে সেই মহাসড়ককে মানুষের জন্য নিরাপদ করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন পরিসংখ্যানের আড়ালে প্রাণহানির এই মিছিল অব্যাহতই থাকবে।