কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:১১ এএম
কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না

বাংলাদেশে কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি স্থায়ী অভিযোগ হিসেবে বিদ্যমান। ক্ষমতার পালাবদল হলেও এই চিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরও কারাগারে মৃত্যুর হার আগের মতোই থেকে গেছে, যা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে কারা হেফাজতে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৫৫ জনের, ২০২৪ সালে ১২০ জনের এবং ২০২৫ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৭২ জন বন্দির। চার বছরে মোট ৬৩২ জন বন্দি কারাগারে মারা গেছেন। এর মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে- ২০২৫ সালে ছয়জন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন। ২০২৪ সালে তিনজন, ২০২৩ সালে দুজন এবং ২০২২ সালে চারজন বন্দি আত্মহত্যা করেছিলেন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে মোট ১৯ জন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব মৃত্যুকে প্রায়শই ‘অসুস্থতা’ বা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু স্বাধীন তদন্ত ও ময়নাতদন্তের অভাবে প্রকৃত কারণ চাপা পড়ে যায়। ফলে দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই সমস্যার মূল। এক সরকারের সময়ে দায়মুক্তি যে পথ তৈরি করেছে, পরবর্তী সরকারগুলো সেই পথ ধরেই হেঁটেছে। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, বন্দিদের চিকিৎসায় অবহেলার সুযোগ নেই। তবে বাস্তবতা হলো, চিকিৎসক সংকট, অ্যাম্বুলেন্স সংকট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে বন্দিদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। দেশের ৭৫টি কারাগারে মাত্র ২৭টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। বেশিরভাগ কারাগারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় পথে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নিহত পরিবারগুলোর অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাদের স্বজন মারা গেছেন। কারা হাসপাতাল থেকে ঢামেক বা অন্যান্য হাসপাতালে পাঠানোর সময় অনেক বন্দি মারা যান। ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করছে, কারাগার থেকে আসা বন্দিদের চিকিৎসায় অবহেলার সুযোগ নেই। কিন্তু পরিবারগুলো বলছে, কারাগারে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয় না, অনেক সময় অসুস্থতার খবরও তাদের জানানো হয় না। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে একজন নাগরিকের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। কেউ অপরাধী হোক বা অভিযোগের মুখোমুখি, তার মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। তাই হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, আইনি ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও রাষ্ট্রের জবাবদিহি দাবি করে। বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাদের অনেককে পরিকল্পিতভাবে কারাগারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময়ও একই অভিযোগ উঠছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, কারা হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া উচিত। তাদের দাবি, অনেক মৃত্যু আসলে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেছেন, সরকারের বিরোধিতাকারীদের ক্ষেত্রে সব সরকারই চায় তারা জেলে গিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করুক। আগের সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তিলে তিলে মারা হয়েছে- এমন অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকারের সময়ে জেল হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। কারা কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি কারাগারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক কর্মরত আছেন। বাকি কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জন অফিস থেকে খণ্ডকালীন চিকিৎসক এসে চিকিৎসা দেন। ৭৫টি কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ২৭টি। ফলে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় পথে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় নানা অজুহাতে কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় প্রক্রিয়া আটকে রেখেছে। এ কারণে ২০১৯ সাল থেকে কারা কর্তৃপক্ষ কোনো অ্যাম্বুলেন্স কিনতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গণঅভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার কাঠামো বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সংস্কৃতি ভাঙতে পারেনি। কারা হেফাজতে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা তারই প্রমাণ। প্রকৃত পরিবর্তন চাইলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে