বাজারে ভেজাল খাদ্যের বিস্তার এখন আর গুঞ্জন নয়, বাস্তব উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া খাদ্যপণ্যের বড় একটি অংশেই ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি মিলছে। সাম্প্রতিক উপাত্ত বলছে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকেত। ফল, শাকসবজি, চাল, হলুদ, লবণ, মাছ ও মুরগি, প্রায় সবখানেই ঝুঁকির ছাপ স্পষ্ট।
চলতি সপ্তাহে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ-এর কর্মকর্তারা চুয়াডাঙ্গায় ‘মৌসুমি ফুড’ নামের কারখানায় অভিযান চালান। এসময় কারখানায় খাবার তৈরির ডালডার ভেতরে মৃত ইঁদুর ভাসতে দেখা গেছে। একই কারখানায় ডালডা দিয়ে তৈরি হচ্ছিল বিভিন্ন নাস্তা। একই সময় শহরের রেলবাজার এলাকার ‘অনন্যা ফুড’ থেকে বাজারজাতের প্রস্তুত মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য জব্দ করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে গিয়ে এমন চিত্র দেখে জরিমানা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই দিনে আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু এই দুটি ঘটনা নয়, বাজারজুড়ে ভেজাল খাদ্যের বিস্তার উদ্বেগজনক। ইফতারি হিসেবে বিক্রি হওয়া রঙিন পানীয় ও খাবারে খাদ্যোপযোগী রংয়ের পরিবর্তে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর রং মেশানো হচ্ছে। পিয়াজু, বেগুনি ও অন্যান্য ভাজাপোড়া বারবার পোড়া তেলে তৈরি হচ্ছে। এতে লিভার ও কিডনি রোগ, ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ত্বকের রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাজারে পাওয়া ৮২টি খাদ্যপণ্যের গড়ে ৪০ শতাংশে ভেজাল বা ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় মানের তুলনায় ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি ডিডিটি, টক্সিন ও কীটনাশকের উপস্থিতি মিলেছে। একই উপাত্তে দেখা গেছে, বাজারের ৩৫ শতাংশ ফলে ও ৫০ শতাংশ শাকসবজিতে রাসায়নিক অবশিষ্ট রয়েছে। ১৩টি চালের নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক, ৫টিতে ক্রোমিয়াম, হলুদের ৩০টি নমুনায় সীসা ও অন্যান্য ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। লবণে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সীসা শনাক্ত হয়েছে। মাছ ও মুরগিতেও ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি মিলেছে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারের ৮৫ শতাংশ ফল পাকানো হয় কার্বাইড, ইথোফেন ও ফরমালিন ব্যবহার করে। জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, মানহীন খাদ্যের সংখ্যা এক বছরে ৮১ থেকে বেড়ে ১৯৯-এ দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ভেজালের দ্রুত বিস্তারের ইঙ্গিত।
ফরমালিন, যা মূলত মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়, মাছ বা ফল টাটকা রাখতে ব্যবহার করা হলে তা শরীরে প্রবেশ করে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। কার্বাইড ও ইথোফেন দিয়ে ফল পাকালে এর সক্রিয় উপাদান স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে এবং পাকস্থলী ও লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মুরগি বা গবাদিপশুকে দ্রুত বড় করতে অতিরিক্ত বৃদ্ধিকারক হরমোন প্রয়োগ করলে সেই হরমোন খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢ়ুকে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এতে ক্যানসার, বন্ধ্যাত্ব, শিশুদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ত্বকের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, “ক্ষতিকর উপাদান শনাক্তে নিয়মিত নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও পরীক্ষাগারে পরীক্ষা চলছে।” সম্প্রতি কেওড়া জল ও গোলাপ জলে অননুমোদিত রাসায়নিক পাওয়া গেলে ব্যবসায়ীদের তা বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জনবল সংকট ও পর্যাপ্ত পরীক্ষাগারের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ বলে স্বীকার করেন তিনি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় নতুন পরীক্ষাগার স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভেজাল ও দূষিত খাদ্যের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হন এবং ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যু ১ লাখ ২৫ হাজার, যা মোট বৈশ্বিক ক্ষতির ৪৩ শতাংশ।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন-এর এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে ভেজাল খাবারের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন। কিডনি রোগে আক্রান্ত হন ২ লাখ, ডায়াবেটিসে ১ লাখ ৫০ হাজার। প্রায় ১৫ লাখ গর্ভবতী নারী প্রতিবছর বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ২০১৫ সালে দিনাজপুরে কীটনাশকযুক্ত লিচু খেয়ে ৮ জনের মৃত্যু এবং ২০১২ সালে একই ধরনের ঘটনায় ১৪ শিশুর প্রাণহানির তথ্যও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল-এর স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, “বাজারের অনেক খাবারে ক্ষতিকর রং, সংরক্ষণকারী রাসায়নিক, ফরমালিন ও অতিরিক্ত তেল থাকে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।” তিনি ভোক্তাদের ঘরে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন এবং ব্যবসায়ীদের ভেজাল বন্ধে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
শ্যামলীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট যক্ষ্মা হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, “ভেজাল খাবার পাকস্থলীর সমস্যা, আলসার, লিভারের ক্ষতি এবং হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।” তার মতে, সুস্থ সমাজ গড়তে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল খাদ্যের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে সব সময় বোঝা যায় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও বিভিন্ন জটিল অসুস্থতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। তাদের মতে, শুধু অভিযান নয়, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি ও কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা জরুরি।
বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের কারাদণ্ড। ২০১৮ সালে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সারা দেশে ৪৩ ধরনের ৫ হাজার ৩৯৬টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করে সবগুলোতেই ভেজালের উপস্থিতি পেয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার পরিস্থিতিতে এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।