গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও গ্যাস লিকেজ এখন আমাদের দেশের একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। সমপ্রতি বাংলাদেশ-এর বিভিন্ন জেলায় গ্যাস লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, যা আমাদের সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেয়। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে আসায়, এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। শিল্পায়নের ফলে চাহিদা বাড়ছে। রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার শুরু হয় ২০০৫ সালে। পাইপলাইনে বাসাবাড়িতে গ্যাস-সংযোগ বন্ধের পর এলপিজির ব্যবহার আরো বেড়ে গেছে। বসতবাড়ি ছাড়াও হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও মোটরগাড়িতে এলপি গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু গ্যাস সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত নীতিমালা থাকলেও নেই কোনো প্রয়োগ। কারিগরি ত্রুটি, অসচেতনতা ও অসতর্কতার ফলে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনায় অপমৃত্যুর তালিকায় গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা এখন শীর্ষের দিকে। ‘এলপিজি বিধিমালা, ২০০৪’-এর তৃতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, কোনো লাইসেন্সধারী লাইসেন্সযোগ্য পরিমাণ এলপিজি লাইসেন্স প্রাপ্ত নন, এমন কাউকে দিতে পারবেন না। কিন্তু কোনো প্রকার লাইসেন্স ছাড়াই এলপি গ্যাস ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। ‘গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা, ১৯৯১’-এর চতুর্থ পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে, গ্যাস পূর্ণ সিলিন্ডার কোনো দ্বিচক্রযানে পরিবহন করা যাবে না, কোন যানে সিলিন্ডার পরিবহনের ক্ষেত্রে সিলিন্ডারের কোনো অংশ উক্ত যানের বাইরে থাকা যাবে না। গ্যাস পরিবহনেও রয়েছে আমাদের অসচেতনতা। জনাকীর্ণ স্থানে গ্যাস সিলিন্ডার আঘাতপ্রাপ্ত হলে কিংবা পড়ে গেলে ঘটতে পারে ব্যাপক প্রাণহানি। গ্যাস-পাইপলাইনের বিভিন্ন ত্রুটির কারণেও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। ঢাকা শহর ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গ্যাস-সংযোগ নেওয়া হয়। এসব গ্যাস-পাইপলাইনে কারিগরি ত্রুটি থাকে, পাইপলাইনের লিকেজের কারণে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা এড়াতে ডিলারসহ গ্রাহকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে। রান্নার পাশাপাশি মোটরযানেও রয়েছে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার। সিলিন্ডার দুর্বল বা মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বাস-ট্রাকে বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বাস-ট্রাকে সাধারণত ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে। গ্যাস ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গাড়ির মালিক নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান থেকে কম মূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার ক্রয় করে গাড়িতে সংযোজন করেন। কম মূল্যের বাড়তি সিলিন্ডারটি অন্যান্য ভালো সিলিন্ডারগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। যার কারণে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণে এ ভয়াবহ বিস্ফোরণ থেকে বাঁচা সম্ভব, বিশেষত পচা ডিমের মতো গন্ধ বা ‘হিস’ শব্দ হচ্ছে কি না, পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারের পর সিলিন্ডার ও চুলা বন্ধ করতে হবে। আমরা মনে করি, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির দায় যেমন রয়েছে; তেমনি অভাব রয়েছে জনসচেতনতার। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কঠোর মনিটরিং বাড়াতে হবে।