২০১৬ সালে প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপন করা হয় অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব। লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের হৃদরোগীদের জন্য স্বল্প খরচে এনজিওগ্রাম ও এনজিওপ্লাস্টিসহ জরুরি সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু এক দশক পেরিয়ে গেলেও যন্ত্রটি কার্যত অচল। মাঝেমধ্যে চালুর উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তা চিঠি চালাচালির গণ্ডি পেরোয়নি। এই অচলাবস্থার মূল্য দিচ্ছেন রোগীরা। হৃদরোগের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ না হলে জটিলতা বাড়ে, কখনো প্রাণহানিও ঘটে। অথচ ফরিদপুরে কার্যকর সরকারি ক্যাথল্যাব না থাকায় রোগীদের ঢাকাসহ বড় শহরে ছুটতে হচ্ছে। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুঝুঁকি। বেসরকারি একটি হাসপাতালে ক্যাথল্যাব সুবিধা থাকলেও তার ব্যয় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। দুই লাখ টাকার বেশি খরচ করে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতা স্থানীয় অনেক পরিবারের। ফলে সরকারি হাসপাতালে স্থাপিত এই যন্ত্রের অচল থাকা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, সামাজিক বৈষম্যও গভীর করছে। দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য বলছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান রয়েছেন; মূল সমস্যা যন্ত্রপাতি সচল না থাকা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মেশিনটি অকেজো হয়ে পড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জাতীয় ইলেকট্রো-মেডিকেল রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে; তারা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও দাবি করেছে, চাহিদাপত্র দেওয়ার পর আর যোগাযোগ হয়নি। অর্থাৎ সমন্বয়হীনতা ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতির মাঝেই আটকে আছে জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। প্রশ্ন হলো, আট কোটি টাকার একটি যন্ত্র বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকলেও জবাবদিহি কোথায়? স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো স্থাপনই শেষ কথা নয়; নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকর তদারকি ও দ্রুত সিদ্ধান্তই প্রকৃত সেবার নিশ্চয়তা দেয়। অন্যথায় উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের জন্য এই ক্যাথল্যাব কেবল একটি যন্ত্র নয়, জীবনরক্ষাকারী অবলম্বন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে জরুরি ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা, প্রয়োজনীয় মেরামত বা প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন উচ্চমূল্যের যন্ত্রপাতি স্থাপনের আগে রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি ও জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্যসেবা বিলাসিতা নয়, মৌলিক অধিকার। অচল ক্যাথল্যাব যেন আর কোনো হৃদস্পন্দন থামিয়ে না দেয়-এ দায় সংশ্লিষ্ট সবার।