দেশে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে ভোক্তাদের দুর্ভোগ যেন শেষই হচ্ছে না। রাজধানী থেকে শুরু করে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করেই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে ভোক্তাদের ১৬০০ থেকে ১৯০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও দাম ২ হাজার টাকাও ছুঁয়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়েছে চাপে। জানা যায়, সরকার এলপিজির ওপর ভ্যাট কমিয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে ভোক্তাদের ওপর সামগ্রিক ভ্যাটের চাপ প্রায় ২০ শতাংশ কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে দাম কমেনি। বিক্রেতারা পরিবহন খরচ, ডিলার কমিশন ও সরবরাহ সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। জানা যায়, খুচরা পর্যায়ে প্রতি সিলিন্ডারে ১০০-১৫০ টাকা লাভ করছে বিক্রেতারা। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সিন্ডিকেটের কারসাজি চলছে। সরকারি দাম কেউ মানছে না। বিইআরসি জানায়, ২০২৪ সালে আমদানি হয়েছিল ১৬ লাখ টন এলপিজি, কিন্তু ২০২৫ সালে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। অর্থাৎ ১ লাখ ৩৫ হাজার টন কম। আমেরিকান ট্রেজারির নিষেধাজ্ঞা ও এলসি জটিলতার কারণে আমদানি কমে যায়। ফলে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সংকট প্রকট হয়। ডিলাররা এই সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে দাম বাড়িয়ে দেয়। বিইআরসি প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করলেও ব্যবসায়ীরা সেই দাম মানছে না। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, বিইআরসি গণশুনানি করে না, ব্যবসায়ীদের জবাবদিহি করায় না। তাদের ক্ষমতা আছে- জরিমানা, মামলা, লাইসেন্স বাতিল- কিন্তু তারা কিছুই করে না। ফলে ভোক্তার পকেট কাটা হচ্ছে। লাইনের গ্যাস অনিয়মিত হওয়ায় সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু সিলিন্ডারের দাম বাড়ায় মাসিক বাজেট ভেঙে পড়ছে। রান্নার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চাপে পড়ছে। বিইআরসি জানিয়েছে, জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে, ভোক্তা অধিদপ্তরকে বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৩২ হাজার টন এলপিজি এসেছে। মার্চে সংকট থাকবে না বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে দাম কমেনি। সংকট কাটছে না কেন- এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, সরকারি দাম বাস্তবে প্রয়োগ হয় না, ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে সিন্ডিকেট, সরবরাহ ঘাটতি ও আমদানি কম, এলসি জটিলতা ও ডলার সংকট, বাজার মনিটরিং দুর্বলতা, লাইনের গ্যাস অনিয়মিত হওয়ায় সিলিন্ডারের ওপর চাপ এবং ভ্যাট কমলেও ব্যবসায়ীরা দাম কমায় না- সব মিলিয়ে বাজারে নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভোক্তাদের জীবনে এর গভীর প্রভাব পড়ছে। মাসিক বাজেটের বড় অংশ এখন গ্যাসের পেছনে চলে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা- সব খাতে চাপ বাড়ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে খাবারের মান কমাচ্ছে, শিশুদের পুষ্টি ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এক-দুইশ টাকার হিসাব করে খরচ করে, সেখানে সিলিন্ডারের জন্য অতিরিক্ত ৪০০- ৫০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এছাড়া, শিল্প ও উন্নয়ন প্রকল্পেও এর প্রভাব পড়ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কারণ গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত। শিল্পে ব্যবহৃত এলপিজির দামও বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ছে। জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারেও এলপিজির দাম ওঠানামা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, ইরান ইস্যু, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। ডলার সংকটও বড় সমস্যা। এলসি খোলায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে সরবরাহ কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন, সেজন্য বিইআরসিকে কঠোর হতে হবে, সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, জেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে, আমদানি বাড়াতে হবে, এলসি জটিলতা কমাতে হবে এবং লাইনের গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।