ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর দিনই দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ কয়েক ডজন নেতাকে হত্যা করা হয় এমন দাবি করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল অত্যন্ত গোপন ও পরিকল্পিত এক অভিযানে এই হামলা চালায়।
নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, খামেনিকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ‘ব্লু স্প্যারো’ নামে শক্তিশালী একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা এই ক্ষেপণাস্ত্রটি বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে মহাশূন্যে উঠে আবার পৃথিবীতে ফিরে এসে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ব্লু স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ১ হাজার ২৪০ মাইল পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। এর আঘাত এতটাই শক্তিশালী যে বিস্ফোরণের ধ্বংসাবশেষ পশ্চিম ইরাক পর্যন্ত গিয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানে এই হামলা চালানো হয়। দিনটি ইসরায়েলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এমন একটি ধারণা তৈরি করেছিলেন যে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এই কৌশলের আড়ালেই আকস্মিক হামলার পরিকল্পনা করা হয়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক কর্মকর্তা জানান, হামলার আগে এমন কিছু ছবি ও তথ্য প্রচার করা হয়েছিল যাতে মনে হয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সাপ্তাহিক ‘সাবাত ডিনার’-এর জন্য বাসায় চলে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে তারা ছদ্মবেশে পুনরায় সদর দপ্তরে ফিরে গিয়ে হামলার প্রস্তুতি নেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুরুতে হামলাটি রাতে চালানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের শনিবার সকালের একটি বৈঠকের তথ্য গোয়েন্দারা জানতে পারলে হামলার সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তেহরানের কেন্দ্রস্থলে পাস্তুর স্ট্রিটে অবস্থিত খামেনির কম্পাউন্ডের ওপর নিবিড় নজরদারি চালাচ্ছিল। সেখানে বসানো নজরদারি ক্যামেরা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
ইরানের স্থানীয় সময় শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ইসরায়েল এফ-১৫সহ বিভিন্ন যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর যুদ্ধবিমান থেকে ‘ব্লু স্প্যারো’সহ প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যা সরাসরি খামেনির কম্পাউন্ডকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ব্লু স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্রটি সোভিয়েত আমলের ‘স্কাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি একটি উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র। যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপের পর এটি মহাকাশে উঠে আবার পৃথিবীর দিকে ফিরে আসে, ফলে আঘাতের সময় এর গতি অত্যন্ত বেশি থাকে এবং মাঝপথে প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হামলার সময় খামেনির কম্পাউন্ড এলাকার একাধিক মোবাইল ফোন টাওয়ারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছাতে না পারে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, এই হামলায় খামেনি ছাড়াও ইরানের ৪০ জনের বেশি শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আব্দুর রহিম মুসাভিসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব দাবির বিষয়ে ইরান সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।