পাবনার ঈশ্বরদীতে এক কিশোরী ও তাঁর দাদিকে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল-নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নে আমাদের সমাজ কতটা ঝুঁকির মুখে। আত্মীয়ের হাতে দীর্ঘদিনের উত্ত্যক্ত ও নিপীড়নের অভিযোগ, বাধা দিতে গিয়ে বৃদ্ধার প্রাণহানি এবং কিশোরীর ওপর নৃশংস সহিংসতা-এ এক গভীর সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একই সময়ে নরসিংদীতে কিশোরীকে তুলে নিয়ে হত্যার অভিযোগও দেখায়, সহিংসতার ভৌগোলিক সীমা নেই; এটি সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা সংকট। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ৭,০৬৮টি মামলা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে ৩১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন; সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১০টি, হত্যাকাণ্ড ৭টি, এবং ধর্ষণের চেষ্টা ৬টি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ-এর হিসাবে, ফেব্রুয়ারিতে ১৮৩ নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পরিসংখ্যানগুলো কেবল দৃশ্যমান অংশ; লজ্জা, ভয় ও সামাজিক চাপের কারণে বহু ঘটনা প্রকাশই পায় না। বিশেষজ্ঞরা যৌন হয়রানিকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখছেন। আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে ঘাটতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের সাহস জোগায়। দ্রুত তদন্ত, সাক্ষী-সুরক্ষা ও সময়বদ্ধ বিচার নিশ্চিত না হলে ‘শূন্য সহনশীলতা’ কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। পুলিশ বলছে, অভিযোগ গ্রহণে গোপনীয়তা ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে; তবে মাঠপর্যায়ে সেই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ৪ মার্চ পালিত বিশ্ব যৌন নিপীড়নবিরোধী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়-এ সংকট কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, নৈতিক ও সামাজিক দায়। দিবসটি ঘিরে সরকারি-বেসরকারি দৃশ্যমান কর্মসূচির ঘাটতি প্রশ্ন তোলে, প্রতিরোধমূলক শিক্ষায় আমরা কতটা বিনিয়োগ করছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বয়সোপযোগী যৌন ও নৈতিক শিক্ষা, অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা, পরিবারে খোলামেলা যোগাযোগ-এসব প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি-ভিত্তিক নজরদারি ও সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি সহায়তার সহজপ্রাপ্যতা ভুক্তভোগীর পুনর্বাসনে সহায়ক হবে। গণমাধ্যমের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ-সংবেদনশীলতা রক্ষা করে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন এবং জবাবদিহি ত্বরান্বিত করা। নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আইন প্রয়োগের কঠোরতা, সামাজিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা-এই তিনের সমন্বয়েই পরিবর্তন সম্ভব। নইলে পরিসংখ্যানের সারিতে নতুন সংখ্যা যুক্ত হবে, আর আমরা হারাবো আরও কিছু সম্ভাবনাময় জীবন। এখনই সময় প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার।