২৬ মার্চ’ ফেব্রুয়ারি , বিকেল ৫টার দিকে হাবিবা জান্নাত মাইশা নামে ৭/৮ বছরের শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। মাইশা জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার বজরদ্দিপাড়ার হাফিজুর রহমানের মেয়ে। জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ মহাসড়কে মালঞ্চ আব্দুল গফুর উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন বটতলায় রাস্তা পারাপারের সময় দ্রুতগামী একটি সিএনজি’র ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই শিশুটি মারা যায়। ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুর নিথর-নিস্প্রাণ দেহ উদ্ধার করেন পথচারিরা। একদিকে রোজার দিন শেষে ইফতারের প্রস্তুতি, অন্যদিকে শিশুর শোকার্ত পরিবারের আহাজারি বাতাস ভারি হয়ে ওঠছিল। এ দৃশ্য পাড়াপড়শিদেরও অশ্রুজলে মর্মাহত করেছে। শিশু মাইশার মর্মান্তিক মৃত্যুর শোক যেন সহ্য হচ্ছিল না। এ যেন কবি ফররুখ আহমেদের পাঞ্জেরি কবিতার রাতপোহাবার কত দেরি সম উপমা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
রাত পোহাবার পর শুক্রবার ঠিক তাই হলো, এক শিশু মাইশা মৃত্যুর বদলা যেন এলাকাবাসির মনে ক্ষোভের দাবানল জ্বলে ওঠলো। তাদের দাবি সড়ক পথে চলাচলে জীবন্ত মানুষের মৃত্যুর আলিঙ্গন আর দেখতে চান না। মাইশার মতো আরো বহু শিশু-নারী-বৃদ্ধাসহ আর কতো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে হবে? না এমনটা হতে দেয়া যাবে না। অবশেষে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্থানীয়দের মাঝে আলোচনা ও পর্যালোচনা চলতে থাকে। একপর্যায়ে রাস্তায় বেপরোয়া যানচলাচলের উপর নজরদারি, চালকদের সচেতনতা, প্রয়োজনীয় বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্পিড ব্রেকার/বিট স্থাপনের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ জন্য দরকার প্রশাসনের আগ্রহ। স্থানীয়দের মাঝে আলোচনায় ওঠে আসে বর্তমান ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক তৎপরতা বা পদক্ষেপ পাওয়া প্রত্যাশার জায়গা কত টুকু? আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা প্রতিবন্ধকতায় টেবিলের ফাইল নিয়ে হাকডাক করবে কে?
সব কল্পনা-জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিক্ষুব্দ জনতা শুক্রবার সকাল থেকেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করেন। এই অবরোধ চলে প্রায় দুপুর পর্যন্ত। এতে সকল যান চলাচল বন্ধ হয়। প্রশাসনের কর্তা বাবু, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ বেশ ক’জন হাজির হন ঘটনাস্থলে। সড়ক অবরোধকারীদের সাথে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়।আন্দোলনকারীরা জানান-মালঞ্চ একটি জনগুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ততম এলাকা। এখানে আছে বেশ ক’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, দু’টি বাজার এবং আকা-বাঁকা সড়ক। ২৪ ঘন্টায় চলাচল করে দূরপাল্লা যান। কয়েক দিন পর পর সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। এই জায়গায় নাই কোন বিট। নাই কোন বিপদ সংকেত। ৮০’র দশকে এই রাস্তাটি ছিল সিএন্ডবি। পরবর্তীতে মহাসড়কে রূপ নেয়। সড়কের বিপদ সংকেতের অভাব যেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের উদাসিনতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সড়ক দুর্ঘটনায় বহু লোক মারা গেছে এর কারণ ও প্রতিকার খতিয়ে দেখা হয় না।
না! আর কোন লোককে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু দেখতে চ্ইা না। প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাসিন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দও আন্দোলনকারীদের দাবির সাথে সহমত পোষণ করেন। ওইদিনই জনগণের এই বাস্তবতায় একমত হয়ে নিরাপদ সড়কের প্রশ্নে-দুর্ঘটনা এড়াতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বিট স্থাপন করেন সওজবি। যার নাম দেয়া হয়েছে মাইশা বিট। এখন প্রশ্ন হলো, একটা বিটের জন্য জনগণকে আন্দোলন করতে হলো কেন? এর আগে সড়ক বিভাগ কিংবা প্রশাসনের কর্তা বাবুদের নজরে আসে নাই? জামালপুুর-দেওয়ানগঞ্জ মহাসড়কের দুই পাশের সোল্ডার না থাকা এবং বিপদ সংকেত না থাকায় বহু যানবাহন উল্টে যাবার ঘটনাও নতুন নয়। এরমধ্যে বেপরোয়া গাড়ি চালকের দায়বদ্ধতাতো আছেই।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিছুদিন আগে সড়কের সোল্ডার বা রাস্তার পাশে মাটি না থাকায় মালঞ্চ এলাকায় মালবাহী ট্রাক উল্টে বসত ঘরে প্রবেশ করেছিল। তারও আগে বেতমারী এলাকায় রাস্তার পাশে সোল্ডারে মাটি না থাকায় কয়েকটি যানবাহন উল্টে যাওয়ার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। রাস্তার পাশের সোল্ডার স্থানে দেখা যায় ঘাস চাষ-বাঁশ চাষ কিংবা বাড়ির আঙ্গিনা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সড়ক বিভাগের সেদিকে নজর নাই। এতেই শেষনয়, রাস্তার এবং ব্রিজের সংযোগ স্থানেও উচু-নিচু। ফলে যানবাহন কিংবা রোগির গাড়ি যাতায়াতেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আশা করি সড়ক বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। আর যাতে মাইশাদের এভাবে মরতে না হয়।
গ্রামীন রাস্তা এখন আরো করুণ। রাস্তার সোল্ডার না থাকায় আগুন নেভাতে যাওয়া ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও আটকে থাকে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে রাস্তায় দ্রুত ধ্বসে যায়। এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে। শুধু কর্তৃপক্ষকেই এগিয়ে আসলে হবে না, জনগণকেও সচেতন হতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে, সকলের তরে। সকল কাজে।