বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যখন উদ্বেগ কাটছে না, তখন রপ্তানির আড়ালে বিপুল অর্থ পাচারের খবর অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামপ্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একটি প্রতিষ্ঠান গত দুই বছরে প্রায় ৮৭৬ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এই ঘটনা শুধু আর্থিক খাতের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিচ্ছবি। রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে অর্থাৎ আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার প্রবণতা প্রমাণ করে যে দেশের আর্থিক তদারকি ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর। আরও উদ্বেগজনক হলো, একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনগণের আমানত রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে, তবে অর্থনীতির কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কেবল কাগুজে আইন যথেষ্ট নয়। দৃশ্যমান ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এনবিআর, কাস্টমস ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সমন্বিত ‘প্রাইস ভেরিফিকেশন’ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি, যাতে রপ্তানি ও আমদানির প্রকৃত মূল্য যাচাই করা যায়। একই সঙ্গে যেসব ব্যবসায়ী করোনাকালীন সংকটের অজুহাত দিয়ে বা ব্যাংকের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের নামে বিদেশে ডলার আটকে রেখেছেন, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। অপ্রিয় হলেও সত্য, আইনের শাসনের অভাব থাকলে লুণ্ঠনকারীরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। এতে সৎ ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হবেন, আর বৈধ রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে বিদেশে অবৈধভাবে গড়ে তোলা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে কূটনৈতিক ও আইনি লড়াই শুরু করতে হবে। ব্যাংক খাতের ভেতরে যারা এই মহোৎসবে সহায়তা করেছেন, তাদেরও জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। জনগণের আমানত রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে, তবে অর্থনীতির কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আমরা মনে করি, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে সরকারের অগ্রাধিকার থাকা উচিত। অর্থপাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দেশের অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হবে।