নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি-নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে একটি আধাসরকারি (ডিও) চিঠি দিয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রীর চিঠি পেয়ে প্রস্তাবের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একটি কমিটিও গঠন করেছে বিদ্যুৎ ও জালানি মন্ত্রণালয়। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিটি গঠনের বিষয়টি সোমবার জানাজানি হলে রাজশাহীতে তোলপাড় শুরু হয়। সামাজিক মাধ্যমে উঠেছে প্রতিবাদের ঝড়। খোদ নেসকোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝেও ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।এদিকে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু সোমবার দুপুরে স্পষ্টভাবে জানান, রাজশাহী দেশের ঐহিত্যবাহী প্রাচীন একটি শহর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। ব্রিটিশ আমলেও বিদ্যুৎ বিভাগের সদর দপ্তর রাজশাহীতে ছিল। রাজশাহী ব্রিটিশ আমলের বিভাগীয় প্রশাসনিক কেন্দ্র, দেশের গোটা উত্তরাঞ্চল ছাড়াও যার আওতাধীন ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মালদা, পশ্চিম দিনাজপুর ও জলপাইগুড়ি জেলাও। রাজশাহীর প্রশাসনিক মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে আমি বিদ্যুৎমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই থাকবে।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপিত চিঠি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য। নেসকোর প্রধান কার্যালয় বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে নিজ জেলায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে পাঠানো আধা-সরকারি চাহিদাপত্রে (ডিও) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উল্লেখ করেন, নেসকোর পরিচালন এলাকা উত্তরের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শেষ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পূর্ব-দক্ষিণের পাবনা জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু সদর দপ্তর রাজশাহীতে হওয়ায় রংপুর বিভাগের অনেক কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে নেসকোর সার্বিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে বলে দাবি তার।
চিঠিতে প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে বগুড়া জেলায় নেসকোর সদর দপ্তর স্থাপন করা হলে সার্বিক অপারেশানাল কাজে গতি আসবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, ব্যয় সাশ্রয়, প্রশাসনিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নের স্বার্থে নেসকোর হেড অফিস বগুড়ায় স্থানান্তর একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত হবে বলেও তিনি মত দেন। এ বিষয়ে অবিলম্বে নীতিগত অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য মন্ত্রীর সদয়, জরুরি ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত কামনা করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ মার্চ বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখার উপসচিব ফারজানা খানম মন্ত্রীর নির্দেশে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করেন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সমন্বয় অনুবিভাগ) মোহাম্মদ সানাউল হককে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রতিনিধিকে সদস্য রাখতে বলা হয়েছে।
এদিকে নেসকো স্থানান্তর উদ্যোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে অনেক কিছুই বগুড়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এবারও যদি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে সরকারেরই বদনাম হবে। প্রাচীন বিভাগীয় শহর রাজশাহীর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ দুর্নীতিতে ভরা। রাজশাহীতে আমরা কিছু মানুষ আছি যারা নেসকোর অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকি। বগুড়ায় চলে গেলে কথা বলার কেউ থাকবে না। তারা যা খুশি তাই করবে। আমরা চাই শিক্ষানগরী রাজশাহীতেও নেসকোর প্রধান কার্যালয় অটুট থাকুক। অন্যথায় নেসকো রক্ষায় রাজশাহীবাসী মাঠে নামতে বাধ্য হবে।
এ বিষয়ে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, লোকমুখে এমন কথা শুনেছি। তবে এ বিষয়ে কোনো চিঠিপত্র আমরা এখনো পাইনি। আমার কর্মকর্তাদের কাছেও জানতে চেয়েছি, তারাও কিছু জানাতে পারেনি। সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, সেভাবেই চলতে হবে আমাদের। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের আলাদা কিছু ভাববার সুযোগ নেই।
এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখার উপসচিব ফারজানা খানম গণমাধ্যমকে বলেন, একটি ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কমিটি করা হয়েছে। কমিটি এক মাস বিষয়টি পর্যালোচনা করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেবে। এরপরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নেসকো প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজশাহী থেকেই প্রশাসনিক ও পরিচালন কার্যক্রম চলছে।
সংস্থাটির কর্মকর্তা কর্মচারীরাও বলছেন, নেসকোকে বগুড়ায় নেওয়া হলে রাজশাহী বিভাগের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কর্মকর্তা কর্মচারীরা আরও জানান, সম্প্রতি নেসকোর অভ্যন্তরে কয়েকজন প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে সরিয়ে বগুড়ায় স্থানান্তরে ভেতরে ভেতরে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন।
তবে নেসকো বগুড়াতে নেওয়ার জন্য কমিটি গঠনের বিষয়টি জানাজানি হলে রাজশাহীর সামাজিক, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিভাগীয় শহর হিসেবে রাজশাহীতে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় অন্য জেলায় স্থানান্তর করা হলে তা শুধু রাজশাহীর মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, বরং এখানে কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে নেসকোর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের রাজশাহী বিভাগের নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের বিভাগীয় প্রধান কার্যালয় ব্রিটিশ আমল থেকে রাজশাহীতে আছে। রাজশাহীতে নেসকোর সকল অবকাঠামো, কর্মকর্তা কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম মেরামত কারখানা রয়েছে। প্রশাসনিক ও অপারেশানাল সকল সুবিধা রাজশাহীতে আছে। পাশাপাশি রাজশাহীতে রয়েছে বিমানবন্দর ও সহজলভ্য ট্রেন যোগাযোগ। রাজশাহী থেকেই ঢাকা ছাড়াও গোটা উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে সহজেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের এই নেতা আরও বলেন, রাজশাহীর বিভাগীয় ও প্রশাসনিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নেসকো একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তর হলে নেসকোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তিলে তিলে দাঁড়িয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে।
২০১৬ সালের ১ অক্টোবর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় ১৬ জেলা নিয়ে নেসকোর কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে ২০০৫ সালে বিউবোর আইনে নেসকোকে কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়। স্বায়ত্বশাসিত এই প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিতরণ করেন। নেসকোর বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। রাজশাহী মহানগরীর তিনটি বিস্তৃত ভবন থেকে বিতরণ, প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।