শেরপুর গারো পাহাড় এলাকা এখন ভয়ংকর সব মাদক পাচারের নিরাপদ রুট তৈরি হয়েছে। ফলে এই জনপদ এখন এক মরণনেশার নীল দংশনে বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ের দুর্গম পথগুলো ব্যবহার করে বাংলাদেশে ঢ়ুকছে নিষিদ্ধ বিভিন্ন মাদকের সঙ্গে কোডিনযুক্ত সিরাপ এবং ট্যাপেন্টাডল ব্র্যান্ডের ট্যাবলেটের বড় বড় চালান।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার হলদীগ্রাম সীমান্ত থেকে ১ লাখ ৩ হাজার ট্যাপেন্টাডল ব্র্যান্ডের ট্যাবলেট জব্দ করেছে । ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) টহল দলের জব্দকৃত এসব মাদকের বাজার মূল্য ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এরপর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে জেলার ঝিনাইগাতী এবং নালিতাবাড়ী সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতীয় মদ, ফেনসিডিল, মরণ নেশার বিষাক্ত ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট জব্দ করে। জব্দকৃত এসব মাদকের মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা। বিজিবি প্রায়ই ভারত থেকে এই সীমান্ত পথে অবৈধভাবে আসা বিভিন্ন মাদক জব্দ করে চলেছে। তারপরও থামছে না অবৈধ মাদকের থাবা। এদিকে ২০২৫ সালে গারো পাহাড়ের এই অঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকার মাদকসহ অবৈধ মালামাল জব্দ করেছে বিজিবি।
জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন ঢালুর দোবাচিপাড়া ও বারাঙ্গাপাড়া এলাকা এখন এই মরণনেশার অন্যতম প্রধান ট্রানজিট। এই এলাকাগুলোতে গভীর রাতে যখন পাহাড় নিস্তব্ধ হয়ে যায় তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। তারা মেঘালয়ের সাউথ গারো হিলসের তুরা ও ঢালু এলাকার পাহাড়ি পথ আর ঘন জঙ্গলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কাঁটাতারের নজরদারি এড়িয়ে বস্তাভর্তি এই মরণনেশা লোকালয়ে নিয়ে আসে। সেখানকার পাচারকারী এখন বেনামি কোম্পানির সিরাপগুলো বেশি বিক্রি করছেন, কারণ এগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়ভাবে প্রতিটি বোতল ১০০ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও বর্ডার পার হলেই এর দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
ভারতের অভ্যন্তরে এই সিরাপগুলো কারখানা থেকে সরাসরি বাজারে আসে না বরং শেল কোম্পানি বা নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়া ইনভয়েস তৈরি করে এগুলো সংগ্রহ করা হয়। পাচারকারীরা আল উকবা, এসবি ফার্মা বা সিং মেডিকোস এর মতো ভুয়া নাম ও জিএসটি নম্বর ব্যবহার করে ভারতের উত্তরপ্রদেশ থেকে হাজার হাজার কার্টুন সিরাপের অর্ডার দেয়। এরপর ট্রাকের ভেতরে ফল সবজি বা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের আড়ালে বিশেষ ফলস বডি তৈরি করে এসব সিরাপ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং মেঘালয় সীমান্তের গুদামগুলোতে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে স্থানীয় ছোট ছোট ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে বোতলগুলো ভাগ হয়ে যায় এবং সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি গ্রামগুলোতে মজুদ করা হয়। এই সিরাপগুলো শেরপুরের নাকুগাঁও, তাওয়াকুচা ও বনগাঁও সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর অত্যন্ত সুকৌশলে ইজিবাইক বা মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকি ও সিটের নিচে লুকিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এসব মরণনেশাকে কোডিন বেজড কফ সিরাপ বা সিবিসিএস হিসেবে চিহ্নিত করছে।এই সিরাপগুলোর ভয়াবহতা কেবল নেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এটি সরাসরি জীবন কেড়ে নিচ্ছে। কোডিন মূলত একটি শক্তিশালী ওপিওড ড্রাগ যা সেবনের পর লিভারে গিয়ে মরফিনে রূপান্তরিত হয় এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে মস্তিষ্কে সাময়িক আনন্দ তৈরি করে। দীর্ঘ মেয়াদে সেবনে এটি মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তা করার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে কমিয়ে দেয়। এই সিরাপ সেবনে কিডনি বিকল এবং স্নায়বিক পক্ষাঘাত হতে পারে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান চৌধুরী জানান, সীমান্তে মাদক, চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধকল্পে বিজিবির কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে এবং এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।