নারীর সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও অধিকার শীর্ষক সম্মেলন ২০২৬ অনুষ্ঠিত

প্রেস বিজ্ঞপ্তি | প্রকাশ: ১৬ মার্চ, ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
নারীর সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও অধিকার শীর্ষক সম্মেলন ২০২৬ অনুষ্ঠিত

রোববার (১৫ই মার্চ) সকাল ১০টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট কমপ্লেক্সের থ্রিডি গ্যালারি হলে খ্রীষ্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিসিডিবি) এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো নারীর সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও অধিকার শীর্ষক সম্মেলন ২০২৬। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ এর প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার—সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ কে সামনে রেখে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য আর্থিক বৈষম্য, জলবায়ু সংকট, জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীর বহুমাত্রিক প্রান্তিকতার অনুসন্ধান, তা থেকে উত্তরণের পথ নির্ধারণ এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এই সম্মেলনে অতিথি  বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. শরমিন্দ নীলোর্মি , অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, উম্মে সালমা সুমি, সহকারী পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন), পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু মন্ত্রণালয়, ফাল্গুনী ত্রিপুরা, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক এবং এডভোকেট কামরুন নাহার, আইনজীবি, নারী পক্ষ। উপস্থিত বক্তারা যথাক্রমে নারী এবং আর্থিক প্রান্তিকতা, জলবায়ু সংকট ও নারীর বহুমাত্রিক প্রান্তিকতা, পরিচয়ের রাজনীতি ও নারীর জাতিগত প্রান্তিকতার প্রশ্ন এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে নারীর প্রান্তিকতা বিষয়ক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। প্যানেল আলোচনা মডারেট করেছেন সিসিডিবির নির্বাহী পরিচালক জুলিয়েট কেয়া মালাকার। নারী এবং আর্থিক প্রান্তিকতা নিয়ে আলোচনাকালীন ড. শরমিন্দ নীলোর্মি বলেন, ‘কৃষক বলতে আমরা যেভাবে পুরুষ কৃষককে স্বীকৃতি দেই, তার স্ত্রী যে মাঠে কাজ করছে সেইটা আমরা স্বীকৃতি দেই না। আমরা যদি কর্মজীবি নারীর ক্ষেত্রেও দেখি, একটি বিশেষ পর্যায়ের পর তার স্যালারি আর বাড়ে না। অথচ নারীরা সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স দেয়। কিন্তু এনবিআর এ কখনোই নারী এবং পুরুষের ডাটা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয় না। এমনকি এনবিআর বিভাগটি কখনোই জেন্ডার বাজেটে অংশগ্রহণ করে না’। তিনি আরও বলেন যে, ‘আমাদের দেশে ৪৫% নারী হেঁটে কর্মস্থলে যায়, যখন মূলধন, রেমিটেন্স কিংবা ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় কথা আনা হয়, তখন এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। সমীক্ষায় দেখা যায় নারী পুরুষের চাইতে কম উৎপাদনশীল, কিন্তু নারীকে দেওয়া হয় সবচেয়ে অনুর্বর জমিটাই’। জলবায়ু সংকট ও নারীর বহুমাত্রিক প্রান্তিকতা নিয়ে উম্মে সালমা সুমি বলেন ‘ জলবায়ু অভিযোজন তখনই কার্যকর হবে তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথা নারীরা তা নিয়ে কাজ করবেন। NAP. CCGAP. LLF জাতীয় এই ফ্রেমওয়ার্কগুলো আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক পথ দেখাচ্ছে”।পরিচয়ের রাজনীতি ও নারীর জাতিগত প্রান্তিকতার প্রশ্ন সম্পর্কে ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, ‘ রোহিঙ্গা সংকটের সময় ৩ মাস বাসা থেকে বের হতে পারিনি, আমাদেরকে রোহিঙ্গা বলে গালি দেওয়া হয়েছে, আমাদের অশ্লীল কথা বলা হয়েছে। আমাদের চেহারার ধরন নিয়ে এই ধরণের কথা আমাদের শুনতে হয়। আদিবাসী নারীরা ধর্ষণের শিকার হলে মামলা নেওয়াতে গাফিলতি করা হয়। এমনকি ভুক্তভোগী বাংলা ভাষায় স্বচ্ছন্দ না থাকার কারণে মামলার এফআইআরও দুর্বল করা হয়।  তবে আদিবাসী মেয়েরা এত প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েও উঠে আসছে, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করছে”। ফাল্গুনী আরও বলেন ‘ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসী নারীকে যুক্ত করতে হবে এবং সত্যিকার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে”।  যারা আইন, নীতিমালা তৈরিতে যুক্ত তাদের প্রতি আদিবাসী প্রান্তিক নারীকে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। নারীপক্ষের সদস্য এবং আইনজীবি কামরুন নাহার বলেন, ‘যে ইতিহাসের পথ ধরে নারী দিবস, এখনও সেই পথটা দুর্গম। অধিকারের জায়গায় কাজ করতে চাইলে সবার প্রথমে সংবিধানে যে ত্রুটি আছে তা নিয়ে কাজ করতে হবে। নারী পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্যমূলক বিধান, ধর্মীয় অনুশাসনের বাধ্যবাধকতার বিধান পরিবর্তন করতে হবে”। তিনি আরও বলেন, ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার। কিন্ত কেবল নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রসঙ্গটাই বেশি আসে, অন্য অধিকার নিয়ে কথাই হয় না”। কামরুন নাহার মনে করেন, এখনও কন্যা শিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয় নি। তাই নারীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে না ভেবে মানুষ ভাবা, শিক্ষায় নারীকে এগিয়ে আনা এবং পরিবারে কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য টহল পুলিশ বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রতিনিধি ও প্রশাসনকে দায়বদ্ধ করার কথাও বলেন। সম্মেলনটি উদ্বোধন করেন সিসিডিবির কমিশন চেয়ারপারসন মিঃ ডেভিড এ হালদার এবং সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন কমিশনের সদস্য ও নারীনেত্রী গীতা দাস। কমিউনিটি প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন গোপালগঞ্জের কল্পতরু বসুন্ধরা মহিলা সমবায় সমিতির সাবেক সভানেত্রী সেবারানী বিশ্বাস এবং নওগাঁর পোরসা এলাকার ক্লাইমেট চেইঞ্জ রেজিলিয়েন্স সেন্টারের সভানেত্রী মহিমা খাতুন। সম্মেলনে সিসিডিবির কৃষিভিত্তিক, জলবায়ুসহনশীল কেন্দ্রিক, গণসংগঠন কেন্দ্রিক নারীর ক্ষমতায়নের একটি প্রদর্শনী করা হয় এবং সারা দেশে সিসিডিবির নারীদের কাজ নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। উল্লেখিত ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হবার পরে সিসিডিবির ৫৩ বছর যাত্রার মূল নেতৃত্বে আছেন কমিউনিটির নারীরা। ২৯টি জেলার ১১টি প্রকল্পে বর্তমানে কাজ করছে সিসিডিবি, প্রায় ৭৯% রেফারেন্স ব্যক্তিই হচ্ছে নারী। ৬১০০০ নারীদের নিয়ে ১০২৩টি ফোরাম রয়েছে সিসিডিবির যারা কেবল নিজেদের ক্ষমতায়ন নয়, বরং সামাজিক বিভিন্ন কাজে নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে এবং সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে