অবশেষে ১২ মার্চ দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর দেশে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বিশেষ করে শেষ তিন মেয়াদে দেশের জনগণের জাতীয় সংসদ নিয়ে তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায়নি। কারণ, একক দলীয় সংসদ সদস্য এবং গৃহপালিত তকমা পাওয়া বিরোধী দল নিয়ে সংসদ আসলে জমেনি। ফলে এর প্রতি জনগণের তেমন আকর্ষণ ছিল না। সংসদ মানে হলো সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে যুক্তি ও তথ্যের কথাযুদ্ধ। আর দুই পক্ষেরই থাকবে দেশ তথা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। কিন্তু আমাদের দেশে সে রকম সংসদের চিত্র পাওয়া বাস্তবিক পক্ষে অসম্ভব। কারণ, এখানে আর কেউ জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আসেন না। যদিও তাঁরা সংসদে আসার আগে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। তারপরেও এবারের সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে দেশের মানুষের আগ্রহ ছিল। গত বৃহস্পতিবার সেই জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে নতুন উদ্যমে শুরু হয় গণতন্ত্রের অবিচল যাত্রা। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। নতুন স্পিকার নির্বাচিত হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এ সময় অধিবেশন মুলতবি হলে তাঁদের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে রাষ্ট্রপতি সংসদকক্ষে প্রবেশ করলে বিরোধীদলীয় সদস্যরা ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। রাষ্ট্রপতির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে এবং অধিবেশনকক্ষের মনিটরে জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়। সরকারদলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালেও বিরোধী জোটের সদস্যরা বসে পড়েন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা একই রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। সংসদে কেন তাহলে রাষ্ট্রপতি অপাঙ্ক্তেয় হবেন? এই ঘটনা প্রমাণ করেছে পুরোনো ব্যবস্থার অবশেষ আর নতুন পরিস্থিতির মধ্যে এখনো একধরনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন বিদ্যমান। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সংসদকে ‘অধিকার লঙ্ঘনকারীদের ক্লাব’ থেকে মুক্ত করে ‘জনগণের সংসদ’ হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে, তা ইতিবাচক। সংসদ কেবল আইন পাসের জায়গা নয়, বরং তা হওয়া উচিত জনমতের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলনের স্থান। বিগত সরকারের সময়ের ‘ডামি সংসদ’ কিংবা ‘একতরফা সংসদ’-এর জায়গা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো বিতর্ক। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে সংসদকে কার্যকর করতে হবে।