বিভক্ত উম্মাহ আর জেগে ওঠা সাম্রাজ্যবাদ

রাজু আহমেদ | প্রকাশ: ১৮ মার্চ, ২০২৬, ০৫:০৫ এএম
বিভক্ত উম্মাহ আর জেগে ওঠা সাম্রাজ্যবাদ
রাজু আহমেদ

শয়তান, ট্র্যাম্প, নেতানিয়াহু আর ইসলামের জঘন্যতম শত্রুদের দ্বারা যা ঘটানোর কথা, দক্ষিণ এশিয়ায় তাই ঘটিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তো ভাইকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা। পাকিস্তানকে পছন্দ করার এরপরেও কি কোনো কারণ আছে। আহারে কাবুল। বোমার আঘাতে দেশটির সমগ্র রাজধানী কাঁপছে। যতদূরে চোখ যায় লেলিহান আগুন আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এক বোমাতেই চার শতাধিক জীবন নাই হয়ে গেলো। এটা তো দেশে-বিদেশের পড়ায় ছবির মতো সাজানো সেই কাবুল। সৈয়দ মুজতবা আলীর ভ্রমণকাহিনীর সেই চিরচেনা কাবুল। যেখানে আব্দুর রহমানরা এখনো সরল বেশেই বাঁচে। 

দশকের পর দশক রাশিয়া আমেরিকা এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন জোটসঙ্গী আফগানিস্তানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। হত্যা করেছে হাজার হাজার মানুষ। ধ্বংস করে গেছে সব সম্ভাবনা। আফগানিস্তানের মতো ভঙ্গুর একটি দেশে পাকিস্তানের এই হামলায় পাকিস্তানকে ধিক্কার, ঘৃণা জানানোরও ভাষা নেই। আগাগোড়া একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে যাদের মদদ ও ইন্ধনে এবং যাদের ওপর হামলা করেছে তা অসম্ভব নিন্দনীয়। মানুষ যুদ্ধটাকেই কেনো বড় হওয়ার জন্য বেছে নিচ্ছে। যুদ্ধে কেবল আক্রান্তই হেরে যায় না। যে মারে সেও তো অমানুষ হিসেবে জাহির হয়। রক্তপাত ঘটিয়ে একটা জাতি সভ্য হতে পারে না। 

আমেরিকা-ইসরাইল জোট হয়ে ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে লাগাতার বোম্বিং করছে। মিসাইল এবং ড্রোনের আঘাতে সমগ্র ইরান তছনছ হয়ে যাচ্ছে। ইরানকে পরাজিত করতে পশ্চিমা জোট এবং তাদের মধ্যপ্রাচ্যের এজেন্ট ব্যবহার করছে আরববিশ্বের মাটি ও ঘাঁটি। মুসলিমদের এই দুর্দশার চিত্র ইতিহাস থেকে কী করে ঘুচবে ও মুছবে? মধ্যপ্রাচ্যের যে সকল মুসলিম দেশ ইরানকে তাদের শত্রু ভাবছে, তাদের এই শত্রুর পতনের পর অন্যান্য আরব দেশও চোখের পলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শূন্য হয়ে যাবে। 

কোনোদিন আমেরিকা-ইসরাইলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আরবদের কেউ আর কথা বলতে পারবে না। চোখে চোখ রাখার তো প্রশ্নই আসে না। যারাই এই ঔপনিবেশিক জোটদের বিরুদ্ধে যাবে তারা খতম হবে এবং পশ্চিমারা এখানে গৃহপালিত ভৃত্যকে ক্ষমতায় বসাবে। আপণা মাংসে হরিণা বৈরী'র মতো আপণা তৈলে আরবের বৈরী দশা হয়েছে। দাও নইলে ধ্বংস হও- আমেরিকার ফাঁদে সৌদিসহ সব আরব দেশ। মধ্যাপ্রাচ্যে কেবল ইরানই ব্যতিক্রম। সিংহের মতো বাচার চেষ্টা করছে তারা এখনও। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে এখনও লড়াই করছে সমানতালে। এই অদম্যতা মানুষদের ইতিহাসে তাদেরকে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবে। 

সারা বিশ্বে যারা গণহত্যা চালিয়েছে আজ তারা পাকিস্তানের বন্ধু হয়েছে। আমেরিকা যার বন্ধু তার আর শত্রুর দরকার পরে না। শাহবাজ শরীফ এবং আসিম মুনির ভাবছে আমেরিকান আব্বারা তাদের রক্ষা করবে। অবশ্যই রক্ষা করবে তবে সেটা তাদের নিজেদের স্বার্থ পূরণ পর্যন্ত। অবশ্য পাকিস্তানের থেকে ভালো কিছু,  কোনো শুভ আচরণ আশা করাও বোকামি। এরা তো সেই দেশ যারা ’৭১ এ বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। হত্যা করেছে ত্রিশ লক্ষাধিক নিরীহগোছের বাঙালি। ইজ্জত নিয়ে লাখ লাখ মা-বোনের। যে আফগানিস্তানকে তারা আজ যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে সেই আফগানদের দ্বারাই পাকবধ হবে। আমেরিকা-ইসরাইল তখন উল্টো ইশারা দেবে এবং ভারত হাততালি দেবে। কেবল সময়ের অপেক্ষা। ইতিহাস পরিবর্তনের সূত্রে বিশ্বাসী।  

মুসলিমরা ঐতিহাসিক বাস্তবতা ভুলে গেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইদের মতাদর্শীদের দেখে মধ্যপ্রাচ্যের শেখরা, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মোড়লরা ধোঁকায় পড়েছে। তাদের আসল উদ্দেশ্য বুঝেও যেন না বোঝার প্রয়াস। এরজন্য  ভয়ানক খেসারত দিতে হবে। ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ এক ভাইয়ের দোষে লাগে না। তৃতীয় কারো বুদ্ধি না নিলেও সংঘাতও ঘনীভূত হয় না। আজ তুচ্ছ ফেরকাকে কেন্দ্র করে জীবনহানির যে সংঘাত চারদিকে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে তাতে কোনো একপক্ষের লাভ-ক্ষতি হবে না। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জিতে যাবে আমেরিকা, ইসরাইল এবং ভারতের জোট। চীন-রাশিয়াও কারো স্থায়ী বন্ধু নয়। স্বার্থের সংঘাত এগিয়ে আসলে তারাও পিছিয়ে যাবে। পশ্চিমাদের সবার আপাতত টার্গেট ইসলাম। ইসলাম হারলে হিন্দু। তারপর বৌদ্ধ। খ্রিষ্টীয় মতবাদকে একমাত্র ধর্ম প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ের পশ্চিমা মুখোশ উন্মোচন করতে শতাব্দীর বেশি সময় লাগবে না। 

স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের ‘ঞযব ঈষধংয ড়ভ ঈরারষরুধঃরড়হং ধহফ ঃযব জবসধশরহম ড়ভ ড়িৎষফ ড়ৎফবৎ’ সূত্রেই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিশ্বকে। আমেরিকান নেতৃত্বাধীন বিশ্বের মুখোশ উন্মোচিত হতে আর বেশিদিন লাগবে না। খ্রিষ্টান ছাড়া অন্যরা নিজেদের মধ্যে হানাহানি করেই কিছুটা ধ্বংস হবে, অনেকটা দুর্বল হবে। তারপর আমেরিকা-ইজরাইল শুরু করবে আসল সংঘাত। ফিলিস্তিনের পাজর ভেঙে দিয়েছে। ইরান যায় যায়। পাকিস্তানের তো আদতে তেমন কিছুই নেই। এরপর কে? আমেরিকা-ইসরাইলের পরের টার্গেটও কী প্রস্তুত?

লেখক : রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে