দেশের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করে বোরো ধানের সফল উৎপাদনের ওপর। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ভরা সেচ মৌসুমে ডিজেলের কৃত্রিম সংকট কৃষকের সেই স্বপ্নকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দৈনিক খবরাখবর থেকে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার সাঁথিয়া এবং নড়াইলসহ বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরছে। বোরো চাষের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিয়মিত সেচ। বিশেষ করে যেখানে বিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা সীমিত, সেখানে হাজার হাজার শ্যালো মেশিন ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। তাড়াশ উপজেলার উদাহরণই এ বাস্তবতার প্রমাণ। সেখানে বিপুল পরিমাণ জমিতে আবাদ হলেও উল্লেখযোগ্য অংশের সেচ সম্পূর্ণভাবে ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে। এই অবস্থায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে চাষাবাদের পুরো প্রক্রিয়াই ঝুঁকির মুখে পড়ে। কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছেন। অনেক দোকান বন্ধ রাখা হচ্ছে বা সীমিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা যায়। কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে তেল বিক্রি হচ্ছে। আবার কোথাও রেশনিংয়ের অজুহাতে প্রয়োজনের তুলনায় অল্প পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সেচ খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাবনার সাঁথিয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেল পাচ্ছেন না। এতে জমিতে সেচ ব্যাহত হচ্ছে এবং ধানের চারাগাছ শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে নড়াইলেও, যেখানে কৃষকেরা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেও এখন সেচ সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বোরো মৌসুমে এ ধরনের সংকট শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় খাদ্য উৎপাদনের জন্যও বড় হুমকি। বোরো ধান দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় অংশ জোগান দেয়। তাই এই মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতার ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। এই বাস্তবতায় প্রশাসনের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তেল সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা জরুরি। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং কৃষি মৌসুমে জ্বালানি সরবরাহে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কৃষকের ঘামেই দেশের খাদ্যভাণ্ডার ভরে ওঠে। তাই তাদের চাষাবাদকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বোরো মৌসুমের এই সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে এর প্রভাব শুধু কৃষকের ক্ষেতেই নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।