জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে, তার আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায়। এতে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও উচ্চ আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশ তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত এগিয়ে আসছে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। গবেষণার ফলাফল শুধু একটি পরিবেশগত সংকটের ইঙ্গিতই দেয় না; এটি জনস্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ বসবাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও সামনে আনে। গবেষণায় ১৯৫০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের বয়স্ক মানুষ বছরে প্রায় দুই হাজার ৫০০ ঘণ্টার বেশি সময় তীব্র তাপ ও আর্দ্রতার মুখোমুখি হচ্ছেন। অথচ গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ সময় ছিল প্রায় দুই হাজার ১৮০ ঘণ্টা। অর্থাৎ, কয়েক দশকের ব্যবধানে বছরে প্রায় ৩৯০ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় মানুষ এমন পরিস্থিতিতে থাকছেন, যখন নিরাপদে স্বাভাবিক শারীরিক কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় বয়স্ক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কার্যত সীমিত হয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার এই সম্মিলিত প্রভাব মানবদেহের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে দ্রুত ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে সামান্য শারীরিক পরিশ্রমেও তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হয়। দক্ষিণ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলো-বিশেষ করে ইন্দো-গঙ্গা সমভূমি, যার মধ্যে বাংলাদেশের বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত-এই ঝুঁকির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সংবেদনশীল। উচ্চ আর্দ্রতা, নিম্নভূমি ভূপ্রকৃতি এবং ঘন জনসংখ্যা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষি, নির্মাণ বা বাইরে শ্রমনির্ভর অনেক পেশায় কাজের সময় কমে গেলে আয় ও জীবিকার ওপর চাপ তৈরি হবে। উন্নত দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কুলিং সেন্টার বা নিরাপদ কর্মপরিবেশ থাকায় মানুষ তুলনামূলক সুরক্ষা পায়। কিন্তু বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে এমন অবকাঠামো এখনো সীমিত। অন্যদিকে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। নগরের সবুজ এলাকা কমে যাওয়া, কংক্রিটের বিস্তার এবং বায়ুদূষণ শহরাঞ্চলে তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে শহরগুলোতে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব তৈরি হচ্ছে, যা তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়ায়। এই বাস্তবতায় কেবল বৈশ্বিক উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে বসে থাকার সুযোগ নেই। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানো বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা, জনসাধারণের জন্য কুলিং সেন্টার তৈরি, কর্মঘণ্টার সময়সূচি সমন্বয় এবং নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতের নয়, এটি ইতোমধ্যে বর্তমানের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। তাই মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।