মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধির বা পরিপক্বতার হেরফেরের কারণেই একটি শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয়। কিন্তু কেন এই হেরফের, তা অজানা। অটিজম পুরোপুরি নিরাময় করা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। কিন্তু সঠিক টেস্ট, চিকিৎসা, থেরাপি এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ জীবন আচরণ স্বাভাবিক গণ্ডির মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব। তবে গবেষকরা মনে করেন, নিচের কারণগুলো অটিজমের জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করে-
প্রভাবক কারণ
১. জিনগত সমস্যা
২. রোগজীবাণুর সংক্রমণ
৩. শরীরের বিপাক প্রক্রিয়ায় গোলমাল
৪. পরিবেশগত সমস্যা
যেহেতু এটি একটি সমষ্টিগত আচরণের সমস্যা, তাই অনেক অটিস্টিক শিশুর সব লক্ষণ থাকে না। তবে ‘অটিজম স্পেকট্রাম অব ডিজঅর্ডার’ বা অটিজমের লক্ষণগুলোকে তিনটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যেতে পারে-
সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে অপারগতা
অটিজম আছে এমন শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বাভাবিক একটি শিশু যেভাবে বেড়ে ওঠে, যেভাবে সামাজিক সম্পর্কগুলোর সঙ্গে ধীরে ধীরে যোগাযোগ তৈরি করে, সে তা করতে পারে না। বাবা-মা বা প্রিয়জনের চোখে চোখ রাখতে, মুখভঙ্গি ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজের চাওয়া বা না-চাওয়া বোঝাতে সে অপারগ হয়। সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না। অমিশুক প্রবণতা থাকে। কোন ধরনের আনন্দদায়ক বস্তু বা বিষয় সে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয় না। শারীরিক আদর, চুমু দেওয়া এবং কোলে নেওয়া তারা মোটেই পছন্দ করে না।
যোগাযোগের সমস্যা
আশপাশের পরিবেশ ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা কমে যায়। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল কথা শিখতে দেরি হওয়া মানেই অটিজম নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুটি কথা বলতে পারলেও একটি বাক্য শুরু করতে দেরি হয় বা শেষ করতে পারে না। কখনো একই শব্দ বারবার উচ্চারণ করে। তিন বছরের কম বয়সী শিশুরা সাধারণত স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলা তৈরি করে, কিন্তু অটিস্টিক শিশুরা তা করতে পারে না।
আচরণের অস্বাভাবিকতা
একই আচরণ বারবার করা, আওয়াজ অপছন্দ করা এবং নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলার প্রবণতা দেখা যায়।
রুটিনে পরিবর্তন হলে তারা অস্থির হয়ে পড়ে বা রেগে যায়।
অটিজম সনাক্তকরণ
যত দ্রুত অটিজম শনাক্ত করা যায়, শিশুর জন্য ততই মঙ্গল। সাধারণত ৩ বছর বয়সের পর নিশ্চিতভাবে সনাক্ত করা যায়। তবে ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যেও সচেতন হলে লক্ষণ বোঝা সম্ভব।
প্রাথমিক লক্ষণ
*দেরিতে হাসা
*কথা না বলা বা দেরিতে বলা
*নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া
*ইশারা বা অঙ্গভঙ্গি না করা
অটিজমের পর্যায়
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণত চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়-
প্রথম পর্যায় (আত্মকেন্দ্রিক): একাকী থাকতে পছন্দ করে।
দ্বিতীয় পর্যায় (অনুরোধকারী): অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সীমিত যোগাযোগ করে।
তৃতীয় পর্যায় (যোগাযোগ স্থাপনকারী): পরিচিত মানুষের সঙ্গে কিছুটা যোগাযোগ করতে পারে।
চতুর্থ পর্যায় (সহযোগী): অন্যদের সঙ্গে সীমিত সময়ের জন্য খেলতে পারে।
যোগাযোগের ধরন
অটিস্টিক শিশুদের যোগাযোগ ভিন্নধর্মী হয়। তারা নিজস্ব উপায়ে অনুভূতি প্রকাশ করে-মাথা নাড়া, হাত নাড়া, ইশারা করা ইত্যাদির মাধ্যমে।
পরিচর্যা ও চিকিৎসা
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের একটি অংশ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। তবে অনেকের জন্য বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।
প্রশিক্ষণের প্রধান ক্ষেত্র
*স্বাবলম্বিতা
*সংবেদনশীলতার সমন্বয়
*ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপি
*ভাষা বিকাশ
*সামাজিক আচরণ
খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা প্রয়োজন। যেমন-
*গ্লুটেনযুক্ত খাবার এড়ানো ভালো
*কেজিনযুক্ত খাবার সীমিত রাখা উচিত
*সহজ শর্করা কমানো দরকার
শেষ কথা
সঠিক টেস্ট, চিকিৎসা, থেরাপি এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে দেশের অনেক শিশুই অটিস্টিক হওয়া সত্ত্বেও স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে সক্ষম হচ্ছে।
লেখক : শিক্ষক, সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট