ঢাকার খুব কাছেই, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় লুকিয়ে আছে এক অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনার নাম-মাইধারচালা পাহাড়। লাল মাটির ঢেউ খেলানো টিলা, চারপাশের সবুজ গ্রামবাংলা আর নীরব প্রকৃতির মেলবন্ধন-সব মিলিয়ে এই অঞ্চলটি এখন ধীরে ধীরে আলোচনায় আসছে চা চাষ ও পর্যটনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে। বাংলাদেশের চা শিল্প দীর্ঘদিন ধরে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নতুন এলাকায় এর বিস্তার ঘটছে। সেই ধারার একটি সম্ভাবনাময় সংযোজন হতে পারে ঘাটাইলের মাইধারচালা। শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামীম আল মামুন জানান, টাঙ্গাইলের মাইধারচালার ভূ-প্রকৃতি চা চাষের জন্য প্রায় আদর্শ। ঢালু পাহাড়ি জমি, লালচে দোআঁশ অম্লীয় মাটি এবং স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা-এই তিনটি উপাদানই চা গাছের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত গবেষণা ও পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করা গেলে এখানকার জমি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনের জন্য দ্রুত উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। দেশে চায়ের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের এই চাপ মোকাবিলায় নতুন চা বাগান গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পঞ্চগড় জেলার সফলতা ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে-সঠিক পরিবেশ ও উদ্যোগ থাকলে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলেও চা চাষ লাভজনক হতে পারে। অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত মাইধারচালায় চা বাগান গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিতে আসবে বড় পরিবর্তন। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কৃষিতে আসবে বৈচিত্র্য, গড়ে উঠবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। চা প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণন-সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। শুধু চা নয়, মাইধারচালার আরেকটি বড় সম্ভাবনা পর্যটন শিল্প। ইতোমধ্যেই এই টিলাটি স্থানীয়দের কাছে দিনভ্রমণের জনপ্রিয় স্পট। টিলার চূড়া থেকে দেখা যায় বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, গ্রামীণ জনপদ আর অপূর্ব সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত।
যদি এই পাহাড়জুড়ে পরিকল্পিতভাবে চা বাগান গড়ে ওঠে, তবে তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ইকোট্যুরিজম। সবুজ চা বাগানের মাঝে হাঁটার পথ, ভিউ পয়েন্ট, রিসোর্ট কিংবা ক্যাফে-সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠতে পারে রাজধানীর কাছাকাছি একটি অনন্য পর্যটন গন্তব্য। দেশের পর্যটন মানচিত্রে যেমন বান্দরবানের সাজেক ভ্যালি, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া কিংবা সিলেটের শ্রীমঙ্গল জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে মাইধারচালাও পেতে পারে নিজস্ব পরিচিতি। তবে সম্ভাবনার এই পথ একেবারে সহজ নয়। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাথমিক বিনিয়োগের অভাব, দক্ষ জনবলের সংকট এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসবে। বিশেষ করে অপরিকল্পিত উন্নয়ন যেন পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন হবে। পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ছাড়া এই সম্ভাবনা টেকসই হবে না।
ড. মামুন আরো বলেন, প্রথমেই প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জরিপ-মাটি ও জলবায়ুর উপযোগিতা যাচাই। এরপর সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ, স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সম্ভাবনা থেকে বাস্তবতায় সব কিছু ঠিকভাবে এগোলে মাইধারচালা পাহাড় শুধু একটি টিলা নয়, হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের চা শিল্প ও পর্যটনের নতুন অধ্যায়। ঢাকার অদূরে এই সবুজ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে, তা টাঙ্গাইলের অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখবে উল্লেখযোগ্য অবদান। মাইধারচালা আজ সম্ভাবনার গল্প বলছে-এখন শুধু প্রয়োজন সেই গল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহসী উদ্যোগ।