সিলেট বিভাগজুড়ে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সীমান্ত ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচারের পাশাপাশি ইউরোপগামী ঝুঁকিপূর্ণ মানবপাচারও চালিয়ে যাচ্ছে এই চক্র। ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
সম্প্রতি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পথে খাবার ও পানির অভাবে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণের মৃত্যু এ নেটওয়ার্কের ভয়াবহতা সামনে নিয়ে এসেছে।
স্বপ্নের ইউরোপ, মৃত্যুর ফাঁদ
অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রামাঞ্চল থেকে তরুণদের সংগ্রহ করে দালাল চক্র। ১২-১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের বিদেশ পাঠানোর চুক্তি করা হয়। প্রথমে ভিজিট ভিসায় ঢাকা বা সিলেট থেকে বিমানযোগে শ্রীলঙ্কা নেওয়া হয়। পরে সৌদি আরব, কুয়েত, দুবাই, তুরস্ক, মিশর ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত লিবিয়া নেওয়া হয়।
লিবিয়া থেকে নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাকে দালালরা ‘গেম’ নামে অভিহিত করে। যেখানে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রাখা হয়, সেই স্থানগুলোকে বলা হয় ‘গেম ঘর’।
তিন সিন্ডিকেটের নাম সামনে
সাম্প্রতিক ঘটনায় তিনটি বড় সিন্ডিকেটের নাম উঠে এসেছে। একটি চক্র গ্রিসে অবস্থান করে পরিচালনা করেন ছাতক উপজেলার বিল্লাল আহমদ, আর দেশে তার ভাই দুলাল লোক সংগ্রহ করেন। অন্য চক্রে জড়িত জগন্নাথপুরের আব্দুল আজিজ ও দিরাইয়ের মুজিবুর রহমান। তাদের সঙ্গে লিবিয়া ও সুদানের নাগরিকরাও যুক্ত।
এছাড়া ‘ফাইভ স্টার এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাচারের অভিযোগ রয়েছে। সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার এলাকার বেশ কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সি সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।
কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় দালালরা
ভুক্তভোগীদের পরিবার জানায়, একেকজনের কাছ থেকে ১০-১৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়। শুধু সুনামগঞ্জের নিহত ১২ জনের পরিবার থেকেই প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মর্মান্তিক মৃত্যু ও নির্যাতনের চিত্র
নিহতদের পরিবার জানায়, লিবিয়ায় দীর্ঘদিন আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন ও অনাহারে রাখা হয়। পরে ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। মাঝপথে নৌযান পথ হারালে খাবার ও পানির সংকটে একে একে মৃত্যুবরণ করেন যাত্রীরা। মৃতদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মামলা ও আইনগত পদক্ষেপ
এ ঘটনায় ৯ জন দালালের বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দুটি মামলা দায়ের হয়েছে। একটি জগন্নাথপুর থানায় এবং অন্যটি দিরাই থানায়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পাচারের বিস্তৃত চিত্র
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন বছরে সিলেট বিভাগ থেকে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ পাচার হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩০ জন উদ্ধার হলেও সাজা হয়েছে ১ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে। বর্তমানে বিভাগীয় মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে ৪৫০টির বেশি মামলা বিচারাধীন।
সীমান্ত ও হুন্ডি নেটওয়ার্ক
বিজিবি জানায়, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও বিয়ানীবাজার সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশু পাচার বেশি হয়। পাচারের অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়, যেখানে স্থানীয় কিছু অনিবন্ধিত ট্রাভেল এজেন্সি জড়িত।
প্রশাসনের বক্তব্য
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জানান, পাচার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবৈধ পথে গেলে সরকারের হস্তক্ষেপ সীমিত হয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ভুক্তভোগী পরিবার শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শোক ও ক্ষোভ
নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের দাবি। মানবপাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর কোনো তরুণ স্বপ্নের ইউরোপে যেতে গিয়ে প্রাণ না হারায়।