ঈদ মানেই পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখা-এমন একটি দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। তবে এবারের ঈদে সেই চিত্রে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা। প্রেক্ষাগৃহে চলছে ‘এ’ (অ্যাডাল্ট অনলি) সার্টিফিকেট পাওয়া সিনেমা, আর সেসব প্রদর্শনীতেই দেখা যাচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের উপস্থিতি। নিয়ম অনুযায়ী এসব সিনেমা কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত হলেও বাস্তবে তার ব্যত্যয় ঘটছে প্রায়ই। সতর্কবার্তা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না-এমন অভিযোগই উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। এবার ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত পাঁচটি ছবির মধ্যে ‘প্রিন্স; ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’, ‘প্রেশার কুকার’ ও ‘রাক্ষস’ পেয়েছে অ্যাডাল্ট সার্টিফিকেট। অথচ বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক অভিভাবকই সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে এসব সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই দর্শকরা সিনেমার ধরন সম্পর্কে আগে থেকে পুরোপুরি অবগত না থাকায় পরে অস্বস্তি ও বিরক্তি প্রকাশ করছেন। তবে টিকিট বিক্রেতাদের দাবি, অধিকাংশ দর্শক জেনেশুনেই টিকিট ক্রয় করছেন এবং ‘এ’ রেটিং থাকা সত্ত্বেও পরিবারসহ সিনেমা উপভোগ করতে আসছেন। একজন প্রেক্ষাগৃহ মালিক জানান, তারা অনেক সময় দর্শকদের নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেন। তবে ঈদের ভিড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। অভিভাবকদের দিক থেকেও রয়েছে ভিন্ন যুক্তি। অনেকেই বলছেন, পরিবার নিয়ে বাইরে বের হলে সন্তানদের আলাদা রেখে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা একসঙ্গে সিনেমা দেখতে বাধ্য হন। যদিও পরে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট সম্পর্কে জানলে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়। অন্যদিকে, কিছু দর্শকের মতে, কয়েকটি সংলাপ বা দৃশ্য বাদ দিলে পুরো সিনেমার অভিজ্ঞতা উপভোগ্য। ফলে তারা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। প্রেক্ষাগৃহ সংশ্লিষ্টরা জানান, বিষয়টি নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, অল্প বয়সে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট দেখা শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে তারা সময়ের আগেই প্রাপ্তবয়স্ক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের নৈতিক ও সামাজিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তার মতে, এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রেক্ষাগৃহে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট দেখতে গেলে টিনএজারদের সঙ্গে না নেওয়াই উত্তম।
নির্মাতাদের বক্তব্য
‘প্রেশার কুকার’ ছবির নির্মাতা রায়হান রাফী বলেন, গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী সিনেমার সার্টিফিকেট নির্ধারিত হয়। দর্শক এখন আন্তর্জাতিক মানের কনটেন্টে অভ্যস্ত, তাই গল্পের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় দৃশ্য উপস্থাপনে সমস্যা দেখেন না তিনি। অন্যদিকে ‘রাক্ষস’ ছবির পরিচালক মেহেদি জানান, তারা গল্পের প্রয়োজনে যতটুকু অপরিহার্য, ঠিক ততটুকুই চলচ্চিত্রে রেখেছেন। দর্শকদের সতর্ক করতেই ছবিটি ‘এ’ সার্টিফিকেট নিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দায় কার?
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের মতে, একটি সিনেমার সার্টিফিকেটই নির্ধারণ করে সেটি কোন বয়সসীমার দর্শকের জন্য উপযোগী। তবে এই নিয়ম বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু বোর্ডের নয়-প্রেক্ষাগৃহ কর্তৃপক্ষ, প্রযোজক এবং সবচেয়ে বেশি অভিভাবকদের সচেতনতাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।