দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেশি থাকা সত্ত্বেও লোডশেডিংয়ের পুনরাবৃত্তি এক গভীর নীতিগত ও কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গ্রীষ্মের শুরুতেই যখন চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে, তখনই সরবরাহ ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-সমস্যা কি উৎপাদন সক্ষমতায়, নাকি জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায়? সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, যেখানে বর্তমান চাহিদা ১৫ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। তবুও প্রতিদিন লোডশেডিং হচ্ছে, যা প্রমাণ করে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট-গ্যাস, কয়লা ও তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা মোট সক্ষমতার বড় অংশ, সেখানে সরবরাহ ঘাটতির কারণে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। একইভাবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও আমদানিনির্ভরতার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও বকেয়া বিল ও আর্থিক সংকটে তা কার্যকর হচ্ছে না। ফলে বাস্তবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উৎপাদন সক্ষমতা অচল বা অব্যবহৃত রয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও নীতিগত সংকটেরও প্রতিফলন। বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ বকেয়া, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ-সব মিলিয়ে একটি জটিল চক্র তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। অন্যদিকে, ভর্তুকি ধরে রেখে বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা স্বল্পমেয়াদে জনস্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রশ্ন সামনে এসেছে, যা বাস্তবসম্মত হলেও এর সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো-গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ ঘাটতি শহরের তুলনায় বেশি, যা আঞ্চলিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়, এটি উৎপাদন, শিক্ষা ও জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধি, বকেয়া পরিশোধে শৃঙ্খলা আনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সাশ্রয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। সার্বিকভাবে, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়, তার টেকসই পরিচালনাই আসল চ্যালেঞ্জ।