জঙ্গল সলিমপুর

দখল, সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা

এফএনএস
| আপডেট: ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:১২ পিএম | প্রকাশ: ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:১২ পিএম
দখল, সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসের এক জটিল প্রতিচ্ছবি। চার দশক ধরে সরকারি খাসজমি দখল, পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি স্থাপন এবং প্লট বাণিজ্যের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এক বিকল্প ক্ষমতাকাঠামো, যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল প্রায় অনুপস্থিত। এলাকাটিতে উৎপাদন সক্ষম পাহাড় কেটে ফেলা, পরিবেশ ধ্বংস এবং অবৈধ আবাসন তৈরির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে পত্রিকার খবরে জানা গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনের প্রয়োজনকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই বসতি ধীরে ধীরে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রিত এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা এই কাঠামো রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় ধরনের অভিযানের মাধ্যমে সেখানে রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে। ক্যাম্প স্থাপন, অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে-রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এই সাফল্য কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। কারণ, সন্ত্রাসের শিকড় কেবল অস্ত্রধারী গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে অবৈধ দখল, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। পাহাড় কেটে তৈরি হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা এবং প্লট বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে সন্ত্রাসীদের পুনরুত্থান সময়ের ব্যাপার মাত্র। অতীতে এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে অভিযান শেষে প্রশাসনিক নজরদারি শিথিল হলে পুনরায় দখলদারিত্ব ফিরে এসেছে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিকও রয়েছে। প্রায় লক্ষাধিক মানুষ এই এলাকায় বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের। তাদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা নতুন সামাজিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি একটি সুস্পষ্ট পুনর্বাসন নীতিও অপরিহার্য। পরিবেশগত দিক থেকেও জঙ্গল সলিমপুর একটি বড় সতর্কবার্তা। অর্ধশতাধিক পাহাড় কেটে ফেলার ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ভূমিধসসহ বিভিন্ন ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই পরিবেশ পুনরুদ্ধারকে এই পরিকল্পনার একটি কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। সার্বিকভাবে, জঙ্গল সলিমপুরে সাম্প্রতিক অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলেও এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ-অবৈধ দখল উচ্ছেদ, সন্ত্রাস নির্মূল, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং বাসিন্দাদের পুনর্বাসন। রাষ্ট্র যদি এই চারটি দিক একসঙ্গে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবেই এই এলাকা সত্যিকার অর্থে আইনের শাসনের আওতায় আসবে।