জ্বালানিতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে: অর্থমন্ত্রী

এফএনএস প্রতিবেদক: | প্রকাশ: ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
জ্বালানিতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে: অর্থমন্ত্রী
ছবি, সংগৃহীত

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ শুক্রবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরে দেয়া বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে, যা বাজেট ও রিজার্ভ-দুটির ওপরই চাপ তৈরি করবে।

তিনি বলেন, এই ভর্তুকি একদিকে যেমন সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর দিকে যাবে, অন্যদিকে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলবে।

‘একটি আমদানি নির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই বাস্তবতার বাইরে নয়। এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে অতিরিক্ত ভর্তুকি দেয়ার প্রয়োজন হলেও সরকার জনগণের কষ্টের কথা মাথায় রেখেছে। এখন পর্যন্ত পূর্ণ সমন্বয় না করে আগের মূল্যই বহাল রেখেছে। এই প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্যে আমাদের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। আমরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছি’-উল্লেখ করেন তিনি।

এসময় অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান, বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকার কেবল অর্থনীতিকেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়নি, বরং দেশের প্রতিটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়ে গেছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের সময় যে দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে মূল সূচকগুলোকে ইতিবাচক ধারায় আনা হয়েছিলো, গত ১৬ বছরে তা ধুলিস্যাৎ করা হয়েছে।

বিগত সরকারের আমলের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থাৎ ৭.১৭ শতাংশে। কিন্তু পরবর্তীতে ভয়াবহ দুর্বৃত্তায়নের কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে সেই প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ শতাংশে নেমে আসে এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়।"

তিনি আরও যোগ করেন, ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের যে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, তা ২০২৩-২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৫১ শতাংশে। একইভাবে কৃষির প্রবৃদ্ধি ৫.৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৩.৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।

কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, যখন একটি অর্থনীতির শিল্প খাতের চালিকাশক্তি হারিয়ে যায়, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষিতে নিযুক্ত হওয়ায় দেশে ‘ছদ্ম-বেকারত্ব’ তীব্রতর হয়েছে এবং তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা আজ সীমিত।

সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও টাকার মান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০১-০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য ছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২৯.৯৪ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এই চিত্র পুরো উল্টে গেছে এবং বিনিয়োগের ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যার ফলে বহিঃখাতের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হয়েছে।

মুদ্রার মানের করুণ দশা তুলে ধরে তিনি বলেন, "২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭.২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে ১২১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান অর্ধেক হয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।"

আওয়ামী লীগ আমলে বাজেট ঘাটতির মান ছিল চরম প্রশ্নবিদ্ধ এবং মেগা প্রকল্পগুলো ছিল অতিমূল্যায়িত, যার সুফল জনগণ পায়নি’-উল্লেখ করেন তিনি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে