চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ প্রবল তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করবে বলে সামপ্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। অর্থাৎ আমাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সরাসরি হুমকির মুখে। বাংলাদেশে জাতীয় গড় তাপমাত্রা হয়তো তুলনামূলকভাবে সহনীয় মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলেই বছরে হাজার হাজার ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ প্রয়োজন হয়। এর মানে হলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক গরমের সঙ্গে মানুষকে লড়াই করতে হয়। সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হবেন শিশু, বয়স্ক ও নিম্নআয়ের মানুষ- যাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নেই। শহরের বস্তি কিংবা গ্রামীণ অনুন্নত ঘরে বসবাসকারীদের জন্য তাপপ্রবাহ যেন এক অদৃশ্য আগুন হয়ে উঠছে। এখানে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট। ধনী দেশগুলোতে শীত নরম হয়ে যাওয়ায় গরমের চাহিদা কমছে, অথচ দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ইতিহাসে যারা সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে, তাদের বোঝা হালকা হচ্ছে; আর যারা নিঃসরণে নগণ্য ভূমিকা রেখেছে, তারাই আজ চরম তাপের দহন বহন করছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন- এটি এক ধরনের ‘কুলিং ট্র্যাপ’। তাপ বাড়লে এয়ার কন্ডিশনের ব্যবহার বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হবে, কার্বন নিঃসরণ আরও বাড়বে, আর উষ্ণতা আরও তীব্র হবে। এই দুষ্টচক্র ভাঙা না গেলে তাপপ্রবাহ নিজেই নিজের জ্বালানি জোগাবে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে ভবিষ্যতে প্রায় সারা বছর প্রচণ্ড গরম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্ষার আগে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বর্ষাকালেও অস্বাভাবিক গরম- সব মিলিয়ে কৃষি, শ্রম ও নগরজীবন অচল হয়ে পড়তে পারে। রাজধানী ঢাকায় বছরে অন্তত দুইবার প্রবল তাপপ্রবাহ নগরবাসীর জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তবে অন্ধকারের মাঝেও আশার আলো আছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তবে প্রাণঘাতী তাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। তাপ-সহনশীল নগর পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব আবাসন, সবুজায়ন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার- এসব আর বিলাসী চিন্তা নয়, বরং টিকে থাকার ন্যূনতম শর্ত। আমরা মনে করি, প্রবল তাপপ্রবাহ নিয়ে আমাদের এখন থেকে প্রস্তুতি থাকা জরুরি।